ট্রেনের টিকিট: আসন কম, নাকি নিয়ন্ত্রণে গলদ
সামনে পূজার ছুটি। শহর ছেড়ে লাখো মানুষ তখন ছুটবেন গ্রামের বাড়ির পথে। তাঁদের বড় ভরসা ট্রেন। প্রতিবছরের মতো এবারও কেউ ভোরে কাউন্টারে দাঁড়াবেন, কেউ মোবাইল ফোন হাতে বসে বারবার টিকিট কাটার চেষ্টা করবেন। কিন্তু বিক্রি শুরুর কয়েক মিনিট পরই দেখা যাবে, টিকিট শেষ। তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, আসন কম, চাহিদা বেশি। কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো, আসন কম বলেই কি টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না? নাকি যে আসনগুলো আছে, সেগুলোর একটা অংশ সাধারণ যাত্রীর হাতে পৌঁছানোর আগেই কোথাও আটকে যাচ্ছে?
সরকারের পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের আইটি অডিটে এই দ্বিতীয় আশঙ্কার কথাই এসেছে। রেলের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থার পাঁচ অর্থবছরের কার্যক্রম দেখে অডিট ২২ ধরনের অনিয়মের আপত্তি তুলেছে। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে সেগুলো প্রকাশ পেয়েছে। তিন প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে নেতৃত্বে আছে সহজ ডটকম। একটি কথা এখানেই পরিষ্কার থাকা দরকার। জবাব ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। তবে আপত্তিগুলো এত গুরুতর যে ছুটির আগে চুপ করে থাকাও চলে না।
অডিটের বিবরণ বলছে, ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে সাধারণ ছাড়ের এক থেকে পাঁচ দিন আগেই, অর্থাৎ যাত্রার ১১ থেকে ১৫ দিন আগে, টিকিট আটকে রাখার সুযোগ আছে। স্টেশনে ভেন্ডরের প্রতিনিধি আর রেলের বুকিং সহকারীর যোগসাজশে যেকোনো রুটের টিকিট কালোবাজারে চলে যাওয়ার ফাঁকও আছে। শতাধিক স্টেশনের অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট চলছে ভেন্ডরের কর্মীদের হাতে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী তাঁদের কাজ কেবল যন্ত্র আর নেটওয়ার্কের রক্ষণাবেক্ষণ। টিকিট বিক্রি, কোটা সমন্বয় বা আসন আটকানোর কাজ রেলের নিজস্ব কর্মীর। ফলে ভোগান্তি কোনো একটি রুটের নয়। রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রাম—সব পথের যাত্রীই একই ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে টিকিট কাটেন।
সমস্যা যে নতুন নয়, তার প্রমাণ ২০২২ সালেই মিলেছিল। টিকিটের টাকা কেটে নেওয়ার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি আসন না পেয়ে শিকল পরে কমলাপুরে অবস্থান নিয়েছিলেন। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযোগের সত্যতা পেয়ে সহজ ডটকমকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে, যদিও হাইকোর্ট পরে তা স্থগিত করেন। অনলাইনে কোটায় টিকিট ব্লক করা বা বুক করা বন্ধ করা এবং অফলাইন-অনলাইনে টিকিট কেনার ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা—সেদিন যে দাবি উঠেছিল, চার বছর পর অডিটের ভাষায় সেই দুর্বলতাই ফিরে এসেছে। অর্থাৎ আশ্বাস ছিল, কিন্তু মাপার মতো কোনো সূচক বা সময়সীমা ছিল না।
প্রণোদনার দিকটাও ভাবার মতো। অডিটের বরাতে সেবাদাতা প্রতি টিকিটে পান মাত্র ২০ পয়সা। সহজের নিজের দাবি অনুযায়ী তারা দিনে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখের বেশি টিকিট বিক্রি করে। চার মাসে ১ কোটি টিকিট ধরলে বৈধ আয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ টাকা। এটি আমার অনুমান, তবু বলা যায়, এত সামান্য আয়ের পাশে যদি আসন আটকে রাখার ক্ষমতা থাকে, তাহলে কড়া নজরদারি ছাড়া ঝুঁকি বাড়ে। চুক্তিতে প্রতিটি লঙ্ঘনে ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। অডিট বলছে, একটি জরিমানাও আরোপ হয়নি। যে ধারা প্রয়োগ হয় না, সে ধারা রেখে লাভ কী? কোনো লাভ নেই। অডিট আরও দেখিয়েছে, ভ্যাটের ঘাটতি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৯০২ টাকা আর রাজস্ব ক্ষতি ৮ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি। অনলাইন লেনদেনের হিসাব প্রতিদিন নিজে থেকে মিলে যাওয়ার কথা। না মিললে বুঝতে হয়, মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থাটাই দুর্বল।
যাত্রীর তথ্যও ঝুঁকিতে। অডিটের ভাষ্য, প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ সেবাগ্রহীতার তথ্য প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই বিদেশের একটি ক্লাউডে রাখা হয়েছে, নিজস্ব ডেটাসেন্টার বা দুর্যোগ পুনরুদ্ধার কেন্দ্রও নেই। ক্লাউড ব্যবহার নিজে অপরাধ নয়, অনুমোদন আর ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়া করাটাই সমস্যা। তথ্য বিদেশে রাখা আর তথ্য পাচার হওয়া এক কথা নয়। দ্বিতীয়টি ঘটেছে কি না, তা স্বাধীন কারিগরি তদন্ত ছাড়া বলা যাবে না। ২০২৫ সালে নির্বাচন কমিশন নিজেই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এনআইডির তথ্য ফাঁসের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল। ঝুঁকিটা মূল সার্ভারের চেয়ে প্রান্তের সংযোগে বেশি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ট্রেনের টিকেট