পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ভোক্তাকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করা হয়। বাজারে একটি পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয় উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দরকষাকষির মাধ্যমে। ভোক্তার আচরণ ও আর্থিক সামর্থ্য পণ্যমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভোক্তার চাহিদার তুলনায় বাজারে যদি পণ্যের উপস্থিতি বেশি থাকে, তাহলে পণ্যটি তুলনামূলক সস্তায় বিক্রি হয়। এতে ভোক্তার উদ্বৃত্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়। এর বিপরীত অবস্থা ঘটলে অর্থাৎ বাজারে ভোক্তার উপস্থিতি ও চাহিদার তুলনায় পণ্যের জোগান কম থাকলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়।
ফলে কনজুমার্স ডেফিসিট অবস্থার সৃষ্টি হয়। বাজারব্যবস্থা সঠিকভাবে চললে ভোক্তার শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ বেশি থাকে। আর যদি বাজারব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে ভোক্তা কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে। বাজারে পণ্যের উপস্থিতি কেমন, তার ওপর ভোক্তার আচরণ অনেকটাই নির্ভর করে। বাজারে অধিক পরিমাণ পণ্যের উপস্থিতি ঘটলে ভোক্তা তার ইচ্ছামতো যাচাই-বাছাই করে পণ্য কিনতে পারে।
এ অবস্থায় ভোক্তা অনেক সময় তার চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণ পণ্য ক্রয়ে উৎসাহিত হয়। আবার বাজারে পণ্যের উপস্থিতি যদি ভোক্তার চাহিদার তুলনায় কম থাকে, তাহলে মূল্য বৃদ্ধি পায়। সেই অবস্থায় ভোক্তা তার চাহিদার চেয়ে কম পণ্য কিনে প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করতে পারে। বাজারে পণ্য উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দরকষাকষির মাধ্যমে পণ্যমূল্য নির্ধারিত হবে, এটাই অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও বিশৃঙ্খল বাজারব্যবস্থায় অর্থনীতির এ সূত্র অনেক সময়ই অকার্যকর হয়ে যায়।
মুক্তবাজার অর্থনীতির মূল সূত্রই হলো, বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হবে উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝে দরকষাকষির মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশের অসংগঠিত বাজারে পণ্যমূল্য নির্ধারণে উৎপাদক ও ভোক্তার ভূমিকা থাকে গৌণ। আমাদের মতো বাজারব্যবস্থায় পণ্যমূল্য নির্ধারিত হয় মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা, যারা ভোগ ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তবে তারা বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক। আর বিত্তের বলে বলীয়ান হয়ে তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
কোন পণ্য কী দামে বিক্রি হবে, তা নির্ধারণ করে মূলত মধ্যস্বত্বভোগীরাই। ফলে বাজারে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়। উৎপাদক ও ভোক্তা কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে। এ অবস্থাকে অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের মৌলিক ও সংকটময় বাস্তবতা বলা যেতে পারে। উৎপাদকরা অধিকাংশ সময়ই স্বল্পবিত্তের হয়ে থাকে। তারা চাইলেও তাদের উৎপাদিত পণ্য ধরে রেখে সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারে না। কারণ তাদের পরিবারের ব্যয়ভার উৎপাদিত পণ্য বিক্রিজনিত কারণে প্রাপ্ত অর্থ দ্বারাই মেটাতে হয়।
আর ভোক্তারাও সুসংগঠিত নয়। উৎপাদক ও ভোক্তার এ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজারে নিরঙ্কুশ অধিপত্য সৃষ্টি করে এবং বজায় রাখে। বাজার ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি চলে যায় সমাজের বিত্তবান শ্রেণির হাতে। তারা তাদের ইচ্ছামতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তারা চাইলেই একটি পণ্যের মূল্য কোনো কারণ ছাড়াই বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার চাইলেই পণ্যমূল্য কমিয়ে দিতে পারে। উৎপাদক ও ভোক্তার এ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে মুষ্টিমেয় বিত্তবান শ্রেণির বাজার দখল করা এবং মুনাফা লুটে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে ‘সরবরাহ শৃঙ্খলের পুঁজিবাদী দখলদারত্ব’ বা ‘অর্থনৈতিক পরজীবিতা’ (capitalist control of supply chain) বলা যেতে পারে। কার্ল মার্কস এ অবস্থাকে নিজের উৎপাদনেরর ওপর শ্রমিক/উৎপাদকের নিয়ন্ত্রণ হারানো হিসাবে বর্ণনা করেছে। কৃষক রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ফলালেও তার হাতে মূলধন না থাকায় উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পুঁজিবাজার
- বাজার ব্যবস্থাপনা