এত উড়োজাহাজ আমরা রাখব কোথায়
একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। নাসিরুদ্দিন জ্জোহা মাথায় বিরাট এক ইটের বোঝা নিয়ে হাঁটছিলেন। পথে তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। বন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে জ্জোহা, এত ইট তোমার মাথায় কে চাপিয়ে দিল, আর এই ইট দিয়ে তুমি কী করবে?’ জ্জোহা উত্তর দিলেন, ‘না না, কেউ চাপিয়ে দেয়নি। বাড়ি করব, তাই ইট আনছি।’
—তোমার তো জায়গাজমি নেই, কোথায় বাড়ি করবে, আর কোথায়ই–বা এই ইট রাখবে?
—সে পরে দেখা যাবে!
যাঁরা মনে করছেন নামটাতে কোনো মুদ্রণবিভ্রাট আছে, তাঁরা ভুল করছেন। তুরস্কের সেই বিখ্যাত নাসিরুদ্দিন হোজ্জা ও আমাদের নাসিরুদ্দিন জ্জোহা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি।
বিমান কেনা নিয়ে প্রশ্ন করতে ভয় হচ্ছে! কোন প্রশ্ন যে গ্রহণযোগ্য আবার কোনটা অগ্রহণযোগ্য, সেটা নির্ণয় করা খুব সহজ কাজ নয়। আমাদের বর্তমান সরকার এসেছে মাত্র আট মাস আগে। এর মধ্যেই ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সম্পন্ন করেছে বা করার পথে। খবর পড়ে যে প্রশ্ন আমার মাথায় প্রথমে এসেছে, তা হলো এত উড়োজাহাজ আমরা রাখব কোথায়?
আরও কত প্রশ্ন যে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে—আমাদের কি এতগুলো বিমানবহর চালানোর মতো অবকাঠামো আছে? কী কী শর্তে এই বিমান কেনা হচ্ছে? বিমান কেনার অর্থায়নই–বা কোথা থেকে হবে? যদি কোনো কারণে চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে হয়, সে সুযোগ কি চুক্তিতে আছে? থাকলে কি খেসারত দিতে হবে?
বিমানমন্ত্রী বলেছেন, ২৫টি বোয়িং কিনতে চুক্তিমতো ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা) খরচ হবে। অবশ্য এসব বিমান পর্যায়ক্রমে ডেলিভারি দেওয়া হবে এবং ডেলিভারির সময় মূল্য পরিশোধ করতে হবে; প্রথমটা আসবে ২০৩১ সালে এবং সর্বশেষ বিমান আসবে ২০৩৫ সালে। অর্থাৎ পুরো অর্থায়ন ও ডেলিভারি সময়টা বর্তমান সরকারের মেয়াদের বাইরে এবং পরবর্তী সরকারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরও প্রশ্ন আছে। সরকারের বয়স মাত্র আট মাস, কখন সময় পেল এসব বিমান কেনা নিয়ে পরিকল্পনা ও দরকষাকষি করার? এত এত বিমান কেনা এবং পরিচালনার জন্য যে ধরনের নিখুঁত বাস্তবায়ন যোগ্যতা যাচাই প্রয়োজন, এসব কি করা হয়েছে?
অনেকে বলবেন, ‘আদার ব্যাপারী’ উড়োজাহাজের এত সব খবর জেনে কী হবে? তবে আজকাল সব ব্যাপারেই সাধারণ মানুষের উৎসাহ যেন একটু বেশি—ছাত্ররা সরকার বানাচ্ছে, ‘তেলাপোকা’রা রাজনীতি করছে আর ‘আদার ব্যাপারী’রা জাহাজ বাদ দিয়ে উড়োজাহাজের খবর নিচ্ছে!
উড়োজাহাজ কেনা নিয়ে একটা বিষয় মানুষের চোখ এড়ায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়! তার দুই দিন পরে ইউরোপিয়ান এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার তথ্যটা এসেছে বিমান মন্ত্রণালয় (বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়) থেকে। দুর্মুখেরা বলবে, মাছ কিনেছে এক পক্ষ, শাক কিনেছে অন্য পক্ষ।
উড়োজাহাজ কেনা নিয়ে সবার মুখে একটা প্রশ্ন বারবার শুনতে পাই—২৫টি বোয়িং কি যুক্তরাষ্ট্র আমাদের মাথায় চাপিয়ে দিয়েছে? আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকতেই কি হঠাৎ করে ১০টি এয়ারবাসের চুক্তি করা হচ্ছে?
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বাংলাদেশ বিমানের যে ট্র্যাক রেকর্ড, তাতে এতগুলো উড়োজাহাজ সুচারুভাবে পরিচালনা করে লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা কি বিমানের পক্ষে সম্ভব হবে? বিমানের ট্র্যাক রেকর্ডটা কেমন?
স্কাইট্রাক্স একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা, যারা পৃথিবীর বিভিন্ন বিমান সংস্থার কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রতিবছর একটা রিপোর্ট তৈরি করে। স্কাইট্রাক্সের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ বিমানের রেটিং পাঁচের মধ্যে তিন। অন্যভাবে বলা যায়, বিমান তিন স্টারের এয়ারলাইনস। এই মান নির্ণয় করা হয় বিমান সংস্থার দেশীয় বিমানবন্দরের মান, সংস্থাটির ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রী ( যেমন আসনের মান), অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এবং পরিচ্ছন্নতা বিবেচনা করে। রেটিংয়ের বড় একটা ফ্যাক্টর হলো কেবিন ত্রু ও অন্য কর্মচারীদের মান ও দক্ষতা।
স্কাইট্রাক্স রিপোর্টে বিমানের পরিচালনা নিয়ে বলা হয়েছে, ‘এয়ারলাইনসটির অনেক অসংগতি রয়েছে, যা তাদের রেটিংকে প্রভাবিত করে। পরিচ্ছন্নতা ও কেবিন রক্ষণাবেক্ষণের দিকে আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কেবিন কর্মীদের পরিষেবা ভালো থেকে বেশ খারাপ পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং এ ক্ষেত্রেও সামঞ্জস্যের পরিবর্তন প্রয়োজন। ঢাকার বিমানবন্দরের পরিষেবার মান এখনো খুব দুর্বল।’