পুকুরে মাছ আর পাড়ে ফল-ফসল

www.ajkerpatrika.com শাইখ সিরাজ প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৪

ঢাকার অদূরে অবস্থিত ধামরাই উপজেলার একটি ছিমছাম ও শান্ত গ্রাম ললিতনগর। একসময় এই বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে ছিল সবুজের সমারোহ আর কৃষির বিস্তার। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে তখন সারা বছর ধরে আবাদ হতো নানা জাতের ফসল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এবং রাজধানীর অত্যন্ত কাছাকাছি হওয়ার কারণে এই এলাকার চিরায়ত দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের বিপুল চাহিদা মেটাতে এই অঞ্চলে যত্রতত্র গড়ে উঠতে থাকে অসংখ্য ইটভাটা। শহরের দালানকোঠা নির্মাণের জোগান দিতে গিয়ে ললিতনগরসহ আশপাশের গ্রামগুলোর উর্বর কৃষিজমির মাটির এক বিশাল অংশ চলে যায় ইট তৈরির কাজে। ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়া হতে থাকে নির্দয়ভাবে। ফলে কৃষিনির্ভর এই জনপদ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলতে থাকে তার চিরচেনা কৃষিচিত্র। সবুজের জায়গা দখল করে নেয় ইটভাটার কালো ধোঁয়া আর শুষ্ক রুক্ষতা। এমন সংকটময় সময়ে ভিন্নমাত্রার এক গল্পের সূচনা হয় ললিতনগর গ্রামে।


এই গ্রামেরই এক শিক্ষিত ও উদ্যমী তরুণ এস এ লালন। ইটভাটার আগ্রাসন আর কৃষির এই দুঃসময়ে তিনি হেঁটেছেন স্রোতের বিপরীতে। লালন তাঁর শৈশব থেকেই অন্তরে ধারণ করে এসেছেন বাংলার কৃষির চিরায়ত ঐতিহ্য। মাটি আর ফসলের প্রতি নাড়ির টান ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রবল। তাই প্রথাগত পড়াশোনা শেষ করে তিনি শহরের কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দামি অফিসে চাকরি খোঁজার বদলে ফিরে আসেন নিজের শিকড়ে। দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নেন কৃষিকেই তাঁর জীবনের প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করবেন। একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণের এমন সিদ্ধান্ত সমাজ ও পরিবারের কাছে শুরুতে কিছুটা বিস্ময়কর মনে হলেও লালন তাঁর লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল।

কৃষিকাজে নেমে কৃষির আধুনিক কলাকৌশল ও মাটির সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়াটা তিনি বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করে নিয়েছেন। কৃষিজীবনের শুরুতে মাছ উৎপাদন বা মৎস্য চাষকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর একটি বড় লক্ষ্য ছিল জমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা। তিনি বিশ্বাস করতেন কৃষিতে সফল হতে হলে এক ইঞ্চি জমিও ফেলে রাখা যাবে না। লালন তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে পুকুরে শুধু মাছ চাষ করেই বসে থাকার সুযোগ নেই। পুকুরের চারপাশের পাড়ের যে পতিত জমিটুকু অবহেলায় পড়ে থাকে তা একজন সৃজনশীল কৃষকের কাছে হয়ে উঠতে পারে উৎপাদনের আরেকটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

এই উদ্ভাবনী ভাবনা থেকেই তিনি তাঁর পুকুরের পাড়ে বিশেষ ধরনের বেড তৈরি করেন। সেই বেডে শুরু করেন নানা জাতের মৌসুমি শাকসবজির চাষাবাদ। তাঁর এই সমন্বিত কৃষি পদ্ধতির সুফলও তিনি পেতে শুরু করেন খুব দ্রুত। এতে একদিকে যেমন তাঁর অব্যবহৃত জমির শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে পুকুরের পানি ও পাড়ের উর্বর জৈব উপাদান কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত কম খরচে উৎপাদিত হচ্ছে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বিষমুক্ত বাড়তি ফসল। পুকুরের তলদেশের কাদামাটি সবজি খেতের জন্য দারুণ প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। আবার সবজিখেতের উচ্ছিষ্ট অংশ মাছের সম্পূরক খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বা প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম লালনের খামারকে একটি আদর্শ সমন্বিত কৃষি খামারে পরিণত করেছে। একই জমিতে মাছের সঙ্গে এই পরিকল্পিত সবজি চাষ লালনসহ অন্যান্য কৃষকের জন্য তৈরি করছে বাড়তি আয়ের এক বিশাল সুযোগ।


তবে বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের কৃষককেও প্রতিনিয়ত নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এখন কৃষিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। অসময়ে বৃষ্টি, তীব্র খরা কিংবা অতিবৃষ্টির কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মাঝে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে কৃষির নানা প্রয়োজনীয় উপকরণের আকাশ ছোঁয়া দাম। রাসায়নিক সার, কীটনাশক, মাছের খাবার থেকে শুরু করে সেচের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের উৎপাদন খরচকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রকৃত অর্থে এই বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের ক্ষেত্রে প্রান্তিক কৃষকই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেকেই অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের বোঝা টানতে না পেরে বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন।


কিন্তু লালন এই কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও হাল ছাড়ার পাত্র নন। তিনি নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন চলমান সব সংকট উতরে কৃষিকাজকে একটি টেকসই ও লাভজনক জায়গায় নিয়ে যেতে। এর জন্য তিনি প্রতিনিয়ত ফল ও ফসল নিয়ে নিজের মতো করে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কোন ফসলে রোগবালাই কম হয়, কোন জাতের সবজি চাষ করলে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানো যায় এবং কীভাবে দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব সেসব বিষয়ে তিনি বিস্তর পড়াশোনা ও মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। লালনের এই নিরলস প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে আধুনিক কৃষিতে এখন কেবল কায়িক শ্রম দিলেই চলে না, বরং প্রয়োজন তীক্ষ্ণ মেধা ও নিজস্ব গবেষণার।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও