কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে কয়েক বছর আগেও যা ছিল কল্পনার বিষয়, আজ তা প্রায় স্বাভাবিক অভ্যাস। একটি চিঠি লেখা, দীর্ঘ প্রতিবেদন সংক্ষেপ করা, কঠিন বৈজ্ঞানিক বিষয় বোঝা, ছবি তৈরি করা, সংগীত পরিবেশনা, অনুবাদ করা, কম্পিউটার প্রোগ্রাম লেখা কিংবা কোনো সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে বের করা—সবকিছুতেই এখন এআই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সাহায্য করতে পারে।
এই প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে মানুষের জ্ঞানচর্চার এক অসাধারণ নতুন হাতিয়ার। কিন্তু এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে—আমরা যদি চিন্তা, স্মরণ, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের কাজ ক্রমাগত এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিই, তাহলে আমাদের নিজস্ব মস্তিষ্কের এসব ক্ষমতার কী হবে? প্রশ্নটি এআই-বিরোধিতার নয়; বরং মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে কাজের সীমানা কোথায় হওয়া উচিত, সেই প্রশ্ন।
মস্তিষ্কের কাজ যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া: ‘কগনিটিভ অফলোডিং’
মানুষ বহু যুগ ধরেই নিজের মানসিক কাজ বাইরের কোনো মাধ্যমের ওপর ন্যস্ত করে আসছে। আমরা ফোন নম্বর মনে না রেখে মুঠোফোনে সংরক্ষণ করি, পথ মনে না রেখে জিপিএস ব্যবহার করি, হিসাব না করে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে রাখার বদলে ক্যালেন্ডারে লিখে রাখি।
মনোবিজ্ঞানে এ প্রবণতাকে বলা হয় কগনিটিভ অফলোডিং, অর্থাৎ নিজের মস্তিষ্কে সম্পন্ন করার পরিবর্তে কোনো মানসিক কাজের অংশ বাইরের একটি ব্যবস্থা বা যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া।
এটি নিজে কোনো অস্বাভাবিক বা ক্ষতিকর প্রক্রিয়া নয়। বরং মানুষের সভ্যতার বিকাশে লেখা, বই, মানচিত্র, ক্যালকুলেটর ও কম্পিউটার—সবই এক অর্থে আমাদের জ্ঞানীয় ক্ষমতার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। কিন্তু জেনারেটিভ এআইয়ের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
ক্যালকুলেটর প্রধানত হিসাব করে, জিপিএস পথ দেখায়; কিন্তু আধুনিক এআই তথ্য খোঁজা থেকে শুরু করে বিশ্লেষণ, যুক্তি সাজানো, সারাংশ তৈরি, সিদ্ধান্তের বিকল্প প্রস্তাব এবং সম্পূর্ণ লেখা তৈরির মতো উচ্চতর জ্ঞানীয় কাজেও অংশ নিতে পারে। ফলে মানুষের চিন্তার কতটুকু অংশ যন্ত্রের হাতে চলে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নটি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্মৃতি তৈরি হয় শুধু তথ্য পাওয়ার মাধ্যমে নয়
মানুষের স্মৃতি কোনো কম্পিউটার হার্ডডিস্কের মতো নয়, যেখানে তথ্য একবার ঢুকিয়ে দিলেই তা স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকে। কোনো বিষয় মন দিয়ে পড়া, নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করা, আগের জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা, ভুল করা, ভুল সংশোধন করা এবং পরে স্মৃতি থেকে তথ্যটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা—এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি শক্তিশালী হয়।
মস্তিষ্কের শেখা ও স্মৃতি গঠনে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস, এন্টোরাইনাল ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সসহ বিস্তৃত স্নায়ুজাল সক্রিয় থাকে এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিউরনের মধ্যকার সিন্যাপটিক সংযোগের শক্তি পরিবর্তিত হয়, যাকে সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটি বলা হয়।
নতুন কোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা, আগের জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা এবং স্মৃতি থেকে তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা শেখা ও স্মৃতিকে দৃঢ় করতে সাহায্য করে। কিন্তু শিক্ষার্থী যদি নিজে চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের আগেই এআইয়ের কাছ থেকে সম্পূর্ণ উত্তর পেয়ে যায়, তাহলে এই প্রয়োজনীয় মানসিক অনুশীলনের একটি অংশ এড়িয়ে যেতে পারে, যাকে কগনিটিভ অফলোডিং বলা হয়।
ফলে সে হয়তো দ্রুত একটি সুন্দর ও নির্ভুল উত্তর পাচ্ছে, কিন্তু বিষয়টি তার নিজের স্মৃতিতে কতটা স্থায়ীভাবে গেঁথে যাচ্ছে তা ভিন্ন প্রশ্ন; কারণ উত্তর পাওয়া আর সত্যিকার অর্থে শেখা এক বিষয় নয়।