অধিকাংশ অপরাধই স্পনসরড ক্রাইম

www.ajkerpatrika.com তৌহিদুল হক প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৬

ড. তৌহিদুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ। অপরাধ, অপরাধ-অর্থনীতি, অপরাধের সমষ্টিভিত্তিক সমাধান, অপরাধের রূপান্তর প্রসঙ্গ নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করেন। সম্প্রতি চাঁদাবাজি, ভবন-বাড়ি দখলের নানা ঘটনা, ছিনতাই বেড়ে যাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ ও প্রতিকার নিয়ে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার সঙ্গে।


মিরপুরে একটি টিকাদান কেন্দ্র দখল করা হয়েছে। এরপর মোহাম্মদপুর ও আদাবরেও এমন ঘটনা ঘটেছে। চাঁদাবাজি, ভবন দখল, ভাঙচুর—এসব প্রায় সব ঘটনায় অভিযোগ এসেছে বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। এই অঘটনগুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?


ড. তৌহিদুল হক: মিরপুরে টিকাকেন্দ্র দখল, একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের অফিস ভাঙচুর ও দখলের অভিযোগ আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। আমরা শুধু চরিত্রগুলোর বদল দেখি। রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করে দখল-বাণিজ্য, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজি বাংলাদেশে অনেক পুরোনো এবং অত্যন্ত শক্তিশালী অপরাধ। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ আমাদের ‘অপরাধ-অর্থনীতি’ ক্রমে আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

খোলা চোখে আমরা দেখি অপরাধীরা সামনে আছে। কিন্তু তাদের পেছনে আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা গোষ্ঠী বা কিছু ব্যক্তি থাকেন। তাঁরা অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি হওয়া থেকে দূরে রাখেন। মামলা হলেও শাস্তির মাত্রা নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। চাঁদাবাজি, দখল ও আধিপত্য বিস্তারের নেপথ্যে যাঁরা থাকেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশ্রয়কে সরকার যদি আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে এই প্রবণতা বাড়তেই থাকবে। আমরা সেটাই দেখছি।


সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল। আর মানুষ তাতে আস্থা রেখেছিল। কারণ, ৫ আগস্টের পর এটি প্রথম নির্বাচিত সরকার। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিবর্তনের একটা আলোড়ন তৈরি করেছে ৫ আগস্ট। কিন্তু আমাদের সমস্যা হলো, নীতিনির্ধারকেরা পরিবর্তনের কথা মুখে যতটা স্বীকার করেন, কাজে ততটা বাস্তবায়ন করেন না।


অপরাধ একধরনের অব্যবস্থাপনার ফল। আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না হলে অপরাধ-সংস্কৃতি বাড়ে। প্রতিটি অব্যবস্থাপনার সঙ্গে অর্থ, রাজনৈতিক সুবিধা এবং ব্যক্তির সুবিধাভোগের বিষয় জড়িত। যাঁরা রাষ্ট্রের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবেন, তাঁরাই যদি নেপথ্যে থেকে নেতৃত্ব দেন এবং সুবিধাভোগী হন, তাহলে সেটা শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর যেকোনো সমাজে একই পরিণতি ডেকে আনবে।

এখন কথা হলো, সব অপরাধী ও অভিযুক্তের ক্ষেত্রে সমানভাবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে। যাঁরা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী, প্রশ্রয়ের মধ্যে আছেন কিংবা সরকারের আশপাশে থাকেন, তাঁরা কার কী দখল করবেন, কার কাছ থেকে চাঁদা নেবেন, কার অফিস বা বাড়ি দখল করবেন, এই পরিকল্পনা করেন। আইন প্রয়োগে ঘাটতি দেখা দিলে এর বৈশিষ্ট্য দাঁড়ায় এই যে, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কারও বিরুদ্ধে হয় না। আইন প্রয়োগ এভাবে হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব নয়।


কিন্তু স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটি বিএনপির বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ। তাঁর এই বক্তব্য কি অপরাধ বাড়াতে উৎসাহিত করবে?


ড. তৌহিদুল হক: স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক সরকার থেকে শুরু করে যত সরকার দেখেছি, সবার মধ্যেই সংকট অস্বীকার করার একটা মানসিকতা আছে। এই মানসিকতা জগদ্দল পাথরের মতো দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকের পিঠে চেপে বসে। মনে করা হয়, নিজের ও দলের নেতা-কর্মীদের ভুল বা অপরাধ স্বীকার করলে জনপ্রিয়তা কমবে আর বিরোধীরা সমালোচনার সুযোগ পাবে।


অভিযুক্তের পরিচয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকার বা সরকারের সমর্থকেরা নানা ব্যাখ্যা দিতে পারেন, কিন্তু তাতে লাভ নেই। কারণ, এটা ১৯৮০ বা ৯০-এর দশক নয়, এটা ২০২৬ সাল। যতটুকু গোপন করার চেষ্টা হয়, ততটুকুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যপ্রমাণসহ বেরিয়ে আসে। এ জন্য এ সময়ে সংকট স্বীকার করে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়াই জরুরি। কোনো সরকার যদি পুরোনো আমলের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে চায়, তাহলে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে তার রাজনৈতিক যোগাযোগে দূরত্ব তৈরি হবে। দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিলে বা সমালোচনাকে সরকারবিরোধিতা বললে সেই দূরত্ব ঠেকানো যাবে না।


সরকার শুরু থেকেই বলছে, তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সরকারপ্রধানের বক্তব্য হলো, আইনবিরুদ্ধ কাজে যে-ই অভিযুক্ত হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যবস্থা নেওয়ার প্রথম ধাপ হলো পরিস্থিতিটা স্বীকার করা। যেখানে যৌক্তিক তথ্যপ্রমাণ ও ভিডিও আছে, সেখানে অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় ও সক্রিয়তা স্বীকার করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সময়; অস্বীকার করে পার পাওয়ার বা জনগণকে ভিন্ন ধারণায় আটকে রাখার সময় এটা নয়। স্বীকার করে সংশোধন করলে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিলে এই সরকারই বরং অধিক জনপ্রিয় হবে। বিরোধী দল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সংস্কারের প্রসঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক অনিচ্ছার যে কথা বলে, তার বিপরীতে জনগণের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।


বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম জানে, দীর্ঘদিনের জঞ্জাল ছয় মাসে সরিয়ে ফেলা যায় না। কিন্তু যেখানে অনিয়ম ও অপরাধ হচ্ছে, সরকার সেটা স্বীকার করুক এবং ব্যবস্থা নিক, এটাই তারা চায়। প্রতিটি ঘটনায় সরকার এটা করতে পারলে জনগণ, বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে একটা কার্যকর রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ তৈরি হবে। তাতে সরকারের জনপ্রিয়তা এবং সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।


সাম্প্রতিক কয়েক মাসে চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। সব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আছে। ৫ আগস্টের পর থেকে এই বাহিনী এখনো কেন সক্রিয় হচ্ছে না? এর দায় কার?


ড. তৌহিদুল হক: এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নির্বাচিত সরকারের সাত মাস পরও কেন তারা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না? আমি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নাতিশীতোষ্ণ অবস্থায় দেখি, অর্থাৎ খুব ভালো নয়, আবার খুব খারাপও নয়।


চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সদিচ্ছায় ভাঙন ও অকার্যকর অবস্থা তৈরি হয়েছে। ঘুরে দাঁড়াতে তাদের সময় লাগবে, রাতারাতি এটা বদলাবে না। তবু যেসব অপরাধে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না বা নিতে পারছে না, আইনগতভাবে দেখলে সেটা তাদেরই বড় দায়।


তবে একটা জটিলতাও আছে। ব্যবস্থা নিতে গিয়ে তারা অনেক সময় বিপাকে পড়ে, আবার না নিলে সমালোচিত হয়। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতায় ব্যবস্থা না নিলে সমালোচনা হয়। আবার সরকারি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারও অপরাধে ব্যবস্থা না নিলে সেটাকে প্রশংসাসূচক একটা অলিখিত সংকেত হিসেবে দেখা হয়। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দোষারোপ করলেই হবে না। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কি না, সেটাও বড় প্রশ্ন।


আরেকটি ব্যত্যয় হলো, এ বাহিনীর নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এখনো পেশাগত দূরত্ব আছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানে আহত-নিহত পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে অন্তর্বর্তী বা বর্তমান সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পুলিশ নিজেরাও নিজেদের অবস্থান ও পেশাদারত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু করতে পারেনি। যে বাহিনী নিজেদের বহু সদস্যের আহত-নিহত হওয়ার বিচারে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে না, তারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আমূল বদলে ফেলবে, এ নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় আছে।


আরেকটি বিষয় সরকারের খতিয়ে দেখা দরকার। চুরি, ছিনতাই, অপহরণ, চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য ও মাদক-বাণিজ্য হলো অর্থের বিনিময়ে ঘটানো অপরাধ! কেউ কেউ হয়তো রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে কারণ হিসেবে দাঁড় করাতে চান। তাঁরা অর্থ দিয়ে অপরাধী তৈরি করছেন কি না বা পেশাদার অপরাধীদের সক্রিয় করছেন কি না, সেটা তদন্ত করা দরকার। কিছু অপরাধের ধরন ও প্রক্রিয়া দেখে আমার মনে হয়, এর সঙ্গে অর্থের যোগ আছে। একে আমরা ‘স্পনসরড ক্রাইম’ও বলতে পারি।


সবকিছুতে পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, দোষারোপ করে এটা নিয়ন্ত্রণ করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। কথায় কথায় বদলি, ভয়ভীতি বা চাকরিগত হুমকি দিলে তাদের মনোবল আরও ভাঙবে, আর অপরাধীরা আরও সক্রিয় হবে।


আমাদের দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর একটা বড় সমস্যা হলো, নীতিনির্ধারণী স্তর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একটা বড় অংশ মনে করে, দল ক্ষমতায় এলে তারা যা খুশি করতে পারবে। বিরোধী দলে থাকতে জেল খেটেছেন, টাকা খরচ করেছেন, ঘরে থাকতে পারেননি, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন। এখন সেই কষ্টের আর্থিক ক্ষতিপূরণ তাঁরা নেবেন, কারও কিছু দখল করে হোক, চাঁদাবাজি করে হোক বা মাদক-বাণিজ্যসহ অন্য অপরাধ করে হোক। এই মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাই এই মুহূর্তে সরকারের অন্যতম কাজ হলো দলের নেতা-কর্মীদের অপরাধমুক্ত রাখা।


মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, সরকার থেকে দলকে আলাদা করা। সরকারগুলো এ কথা বলে কিন্তু দিন শেষে করে না। গত সাত মাসে আমরা সরকারের কার্যক্রম দেখেছি, দলের কার্যক্রম দেখছি না। অথচ সরকারের মেয়াদ নির্দিষ্ট, দলের আসলে কোনো মেয়াদ থাকে না। দলকে যদি রাজনৈতিকভাবে কার্যকর ও ক্রিয়াশীল না রাখা হয়, ধীরে ধীরে তার কার্যক্রম সীমিত হবে এবং জনগণের সঙ্গে দূরত্ব বাড়বে। মেয়াদ শেষে জনগণের সামনে কী নিয়ে যাবে? তাই সরকারের উচিত দলকে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ক্রিয়াশীল এবং আরও জনবান্ধব করা।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও