ইসলামের আলোকে প্রবীণদের প্রতি করণীয়
মানুষ জন্মের পর শৈশব, কৈশোর ও যৌবন পার করে বার্ধক্যে উপনীত হয়। পবিত্র কোরআন মাজিদে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেন। অতঃপর তোমাদের মৃত্যু ঘটান। আর তোমাদের মধ্যে কেউ পৌঁছে যায় জরাগ্রস্ত বার্ধক্য বয়সে। ফলে জানার পরেও সে আর কিছুই জানবে না (অর্থাৎ জানা জিনিস ভুলে গিয়ে শিশুর মতো হয়ে যাবে)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৭০) ‘তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়। অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তি দান করেন। অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা চান তা–ই সৃষ্টি করেন। তিনিই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৫৪)
শুভ্রকেশবিশিষ্ট বৃদ্ধ মুসলিমের বিশেষ মর্যাদার বিষয়ে আমর বিন শুআইব বর্ণনা করেন, ‘যদি কেউ সাদা চুলবিশিষ্ট হয়, আল্লাহ তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন, পাপ মোচন করে দেন এবং একটি পুণ্য লিখে দেন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৬৯৩৭; আবু দাউদ: ৪২০২; ইবনু মাজাহ: ৩৭২১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে মুসলিম সাদা চুলবিশিষ্ট হবে, কিয়ামতের দিন এটা তার জন্য জ্যোতি বা আলো হবে।’ (তিরমিজি: ১৬৩৪)। ‘নিশ্চয় শুভ্রচুলবিশিষ্ট মুসলিমকে সম্মান করাই আল্লাহকে সম্মান করার শামিল।’ (আবু দাউদ: ৪৮৪৩)। ‘প্রবীণদের সঙ্গেই তোমাদের কল্যাণ ও বরকত রয়েছে।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম: ২১০)
একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তির সংবাদ দেব না?’ তাঁরা বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর রাসুল (সা.)!’ তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি উত্তম, যে দীর্ঘ আয়ু লাভ করে এবং সুন্দর আমল করে।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৭২১২)
পিতা-মাতার যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও উপাসনা কোরো না এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো। তাঁদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহলে তুমি তাঁদের প্রতি “উহ্” শব্দটিও কোরো না এবং তাঁদের ধমক দিয়ো না। আর তাঁদের সঙ্গে নরমভাবে কথা বলো। আর তাঁদের প্রতি মমতাবশে নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত করো এবং বলো, “হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাঁদের প্রতি দয়া করো, যেমন তাঁরা আমাকে ছোটকালে দয়াবশে প্রতিপালন করেছিলেন।”’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৩-২৪)
পিতা-মাতা অমুসলিম হলেও তাঁদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে। যেমন আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আমার মা মুশরিক অবস্থায় আমার নিকট এলেন। আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট ফতোয়া চেয়ে বললাম, তিনি আমার প্রতি খুবই আকৃষ্ট। আমি কি তাঁর সঙ্গে সদাচরণ করব? তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তুমি তোমার মায়ের সঙ্গে সদাচরণ করো।”’ (বুখারি: ২৬২০; মুসলিম: ১০০৩)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যকার প্রবীণ ও জ্ঞানী লোকেরা যেন আমার কাছাকাছি দাঁড়ায়। তারপর পর্যায়ক্রমে দাঁড়াবে যারা তাঁদের কাছাকাছি, তারপর দাঁড়াবে যারা তাঁদের কাছাকাছি তারা।’ (মুসলিম: ৪৩২; আবু দাউদ: ৬৭৪)
উবায়দুল্লাহ বিন উমর বলেন, ‘আমি সুলায়মান বিন আলীর নিকট ছিলাম। এ সময় কুরাইশ গোত্রের জনৈক প্রবীণ ব্যক্তি প্রবেশ করলেন। সুলায়মান বললেন, “এই প্রবীণ ব্যক্তির দিকে লক্ষ করো, তাঁকে উপযুক্ত আসনে বসাও।”’ (মুসনাদে আহমাদ: ৪৬০)
একবার মুহাইয়াসা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট কথা বলার জন্য অগ্রসর হন। তখন রাসুল (সা.) মুহাইয়াসাকে বললেন, ‘বড়কে কথা বলতে দাও, বড়কে কথা বলতে দাও।’ তিনি এতে বয়সে প্রবীণ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করেছেন। (বুখারি: ৭১৯২; মুসলিম: ৩১৬০)
দুনিয়াতে তিনটি এমন জিনিস আছে, যা দেখলেই সওয়াব হয়—কাবা শরিফ, কোরআন মাজিদ ও পিতা-মাতার চেহারা মোবারক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো সন্তান স্বীয় পিতা-মাতার প্রতি মহব্বতের নজরে দৃষ্টিপাত করে, আল্লাহ–তাআলা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজের সওয়াব দান করেন।’ সাহাবিগণ বললেন, ‘যদি দৈনিক এক শতবার তাকায়?’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহ মহান ও পবিত্র।’ (বায়হাকি)
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রবীণ নাগরিক
- ইসলামের বিধান