সাহিত্য যখন জাতে ওঠার সিঁড়ি
সাহিত্যের মাঠ বিভক্ত নানান ঘরানা ও সিন্ডিকেটে। জাতে ওঠার বহুধারার ঘরানায় যুক্ত হতে নিবিড় সাধনায় কতক তল্পিবাহক! শিল্প-সাহিত্য যখন সামাজিক বোধ জাগরণের বদলে জাতে ওঠার সিঁড়ি হয়ে ওঠে, তখন সাহিত্যের ঘরানাভুক্ত হতে নীতি-আদর্শের বলি দিয়ে জাতে ওঠার অক্লান্ত পরিশ্রম করেন লেখক, গবেষক ও শৈল্পিক বোধের দাবিদার তল্পিবাহকেরা। তখন চারপাশ দেখে শুধু কান্না আসে।
এ দেশের প্রাচ্যের বিশ্ববিদ্যালয়খ্যাত এমন উচ্চতর মাদ্রাসা-খ্যাত প্রতিষ্ঠানে এমনও শিক্ষক আছেন, যাঁরা মনে করেন, শহীদ মিনার বিশাল জায়গাজুড়ে থেকে জায়গার অপচয় হচ্ছে। সেই বিদ্বান যতই জ্ঞানী ও বিদ্যাধরী হন, তাঁর সঙ্গে কি ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলে? তথাপি যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তি দাবি করেন, তাঁরা কীভাবে এমন ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করেন, বলুন তো? এমন বক্তব্য যিনি রাখেন, তাঁর সঙ্গে যে কোনো মুক্তমনা, সৃজনশীল মানুষের বোধে চরম ধাক্কা লাগারই কথা। উপরন্তু তাঁরা আবার নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঘরানা বলে দাবি করেন!
কীভাবে পারেন এমন মন্তব্য মেনে নিয়ে পরের আলোচনা এগিয়ে নিতে? অসম্ভব! কেন? কারণ এ দেশের স্বাধীনতার মাহাত্ম্যবিরোধী ন্যারেটিভ তো প্রথম আলোচনার টেবিলেই ভেঙে পড়া উচিত। আরও বৃহৎ প্রসঙ্গ হলো, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মের চিন্তার সূতিকাগার ও বাতিঘর তো সেই ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৫৬—এভাবে ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা ও চেতনায় স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের কাঠামো তৈরির সূচনা হয়েছে। সেই ভাষা আন্দোলনের স্মারক ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে’ স্থানের অপচয় মনে করা ব্যক্তির অন্য কোনো গ্রহ থেকে পাওয়া ডিগ্রির মূল্য, মর্যাদা বা ভ্যালু কতটুকু হতে পারে?
যাঁর চিন্তার গোড়াতেই গলদ, তাঁকে এত আমলে নিয়ে বোধ ও নীতির রফাদফা করে দীর্ঘ আলোচনার ফলাফল আর যা-ই হোক, ব্যক্তির একান্ত লাভগত ও স্বার্থগত! আসুন, এই ব্যক্তিস্বার্থ ও লাভের ধারায় প্রবাহমান এ দেশের শিক্ষা-সাহিত্যের বিশাল বক্ষের কৃষ্ণগহ্বরের নানান খাত-খতিয়ান তুলে ধরি।
এ দেশের শিক্ষা নানা ধারায় বিভক্ত। সাহিত্যের মাঠও বিভক্ত রাজনৈতিক মত, মতাদর্শ—ডান-বাম এবং হালের গুরুত্বপূর্ণ ‘ডিপ স্টেট’ বলয় বা সাম্রাজ্যবাদী এ দেশীয় এজেন্ট হবেন কি হবেন না—এই বহুধা বিভক্ত বলয়ে। তাই সঙ্গত কারণেই পচন খোদ মস্তিষ্কে। তাই তো নাকে রুমাল চেপে চলার দিন পেরিয়েছে সেই কবেই! হালের কয়েক পদের মাস্ক নাকি চাপিয়েও কাজ চলে না! মানে, দুর্গন্ধের দুর্গতি এড়ানো যায় না।
ভাবলে বিস্ময় জাগে, হালের সৃজনশীল-শৈল্পিক মনন দাবিদার কতকেরা কীভাবে এতটা পথভ্রষ্ট? সামাজিক বোধের জাগরণের যে শিল্প, সাহিত্য ও মননের মিছিল হওয়া উচিত, বাস্তবে তা কিন্তু নয়। বরং শৈল্পিক, সৃষ্টিশীল, বোদ্ধা লেখক, গবেষক, কবি—খ্যাত সাহিত্যের সাধকেরা বিভক্ত বহুধারায়। আর এই বিভক্তি রাজনৈতিক দল, মত বা মতাদর্শে নয়। কিংবা লেখনির ধার ও ক্ষুরধারতার নানান ধরনের ভিত্তিতেও নয়। বরং এই বিভক্তি নীতি-নৈতিকতার পক্ষ ত্যাগ করে সরাসরি জাতে ওঠার তাড়ায়। আরও স্পষ্টভাবে লিখলে, উন্নত জীবন ও উন্নত দেশে অভিবাসনের সুপ্ত ও গুপ্ত অভিলাষের একেবারে বৈষয়িক প্রাপ্তির জন্য নীতি, আদর্শ ও পক্ষ ত্যাগের বিভক্তি!
নামে নামে নানান ব্যক্তি-ইমামের নেতৃত্বে বিভক্ত ঘরানাভিত্তিক সাহিত্যের শৈল্পিক মন ও সৃজনী লেখকগোষ্ঠী। এই ঘরানাভিত্তিক সিন্ডিকেটভুক্তিতে আজ আমরা এতটা নির্লজ্জ—ভাবলে বিস্ময়কর লাগে। অবশ্য ঘরানা-সিন্ডিকেটভিত্তিক সাহিত্যের বহুধা বিভক্তির পেছনের কারণটি কিন্তু ক্ষমতা, মর্যাদা ও ইগোকেন্দ্রিক। তাই এ দেশে সেই ঘরানার অপার ক্ষমতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সাহিত্য চর্চা