মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তাকাঠামোর আবির্ভাব
ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সামরিক উপস্থিতিও সরে গেছে। ২০০৩ সালের আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক অধ্যায়ের সমাপ্তি শুধু ইরাকের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ, যে সময়ে মার্কিন সেনারা ইরাক ছাড়ছেন, একই সময়ে ওয়াশিংটন-তেহরান সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে আছে।
এই প্রত্যাহার ওয়াশিংটন-বাগদাদের ২০২৪ সালে হওয়া সমঝোতার অংশ। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন ইরাকের ভেতরে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব শক্তিশালী এবং দেশটির নিরাপত্তাকাঠামোর একটি অংশ এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চলে যাওয়ার পর প্রশ্নটি কেবল ‘কে ইরাকের নিরাপত্তা দেবে’, তা নয়, বড় প্রশ্ন হলো ‘ইরাকের নিরাপত্তাকাঠামোর ভেতরে কার প্রভাব বাড়বে এবং সেই পরিবর্তন আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে কোথায় নিয়ে যাবে।’
ইরানের কাছে ইরাক সাধারণ কোনো প্রতিবেশী নয়। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, গভীর রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ইরাককে তেহরানের আঞ্চলিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত করেছে।
মার্কিন বাহিনী এত দিন এই প্রভাবের বিরুদ্ধে সামরিক ভারসাম্য তৈরি করেছিল। বিশেষ করে মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারি, বিমান সক্ষমতা, ড্রোন, বিশেষ অভিযান এবং সামরিক অবকাঠামো ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি নিরন্তর চাপ তৈরি করত। এখন সেই সামরিক উপস্থিতি নেই। ফলে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো আরও উৎসাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে ইসলামিক স্টেটও নিরাপত্তা শূন্যতার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
তবে এর অর্থ ইরান রাতারাতি ইরাকের নিয়ন্ত্রণ নেবে, এমন নয়। বরং পরিবর্তনটি আরও সূক্ষ্ম। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সরে যাওয়ায় ইরান-সমর্থিত শক্তিগুলোর ওপর যে সামরিক প্রতিরোধ ও চাপ ছিল, সেটি কমে যাচ্ছে। ফলে বাগদাদের রাজনীতি, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণে তেহরানের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র বাড়তে পারে।
ইরাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন শুধু মিলিশিয়াগুলো অস্ত্র জমা দেবে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, তারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকাঠামোর মধ্যে কী অবস্থান নেবে। ইরাকে ইরান-সমর্থিত বহু সশস্ত্র গোষ্ঠী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের (পিএমএফ) অংশ। পিএমএফ আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকি নিরাপত্তাকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হলেও এর বিভিন্ন অংশ অতীতে স্বাধীনভাবে কাজ করেছে এবং মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলাও চালিয়েছে।
বাগদাদ এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের অধীনে আনতে এবং তাদের ভারী অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কয়েকটি অস্ত্র পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র চলে যাওয়ার পর রাষ্ট্র বনাম মিলিশিয়া দ্বন্দ্বের বদলে রাষ্ট্রের ভেতরে মিলিশিয়ার প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই পার্থক্যটি ছোট মনে হলেও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এর ভার অনেক। কারণ, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল, পার্লামেন্টারি শক্তি, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং নিরাপত্তাকাঠামোর অংশ হয়, তাহলে তাকে কেবল সামরিক সংগঠন হিসেবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মধ্যপ্রাচ্য
- নিরাপত্তা ব্যবস্থা