আয়ু বাড়ছে, প্রস্তুত তো সমাজ
মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘ জীবন, কিন্তু সেই দীর্ঘ জীবনের অবধারিত পথ ধরে একদিন বার্ধক্য এসে দরজায় কড়া নাড়ে। সেই চিরন্তন বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাই যেন রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের তরে আমি বাঁচিবারে চাই।” এই উচ্চারণে শুধু দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার আকুতি নয়, আছে জীবনকে অর্থবহ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলার প্রত্যয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে আজ মানুষ আগের চেয়ে দীর্ঘ জীবন লাভ করছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১২০ কোটি থেকে বেড়ে ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ তখন বিশ্বের প্রায় প্রতি পাঁচজন মানুষের একজন হবেন ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী। দীর্ঘায়ু মানবসভ্যতার বড় অর্জন হলেও এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন দায়িত্ব। বাড়তি বছরগুলো কি হবে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আয়, স্বনির্ভরতা ও সামাজিক মর্যাদায় ভরা?
এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই ২০২৬ সালের বিশ্ব প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য, “The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Lives”, অর্থাৎ ‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোকে নতুন করে ভাবা’। দীর্ঘ জীবন যখন নতুন সামাজিক বাস্তবতা, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রচলিত ব্যবস্থাগুলোকেও সেই বাস্তবতার উপযোগী করে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশও দীর্ঘায়ুর এই পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যে প্রবেশ করেছে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে ৬০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের অংশ ৩.৩৯ শতাংশ এবং ৬৫ থেকে ৬৯ বছর বয়সীদের অংশ ২.৩৮ শতাংশ। এর সঙ্গে ৭০ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের যুক্ত করলে ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে এই সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠী এখন আর ছোট কোনো জনগোষ্ঠী নয়, বরং দেশের জনমিতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের জীবনযাপন, স্বাস্থ্য, আয়, নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণ তাই জাতীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া প্রয়োজন। অথচ আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বড় অংশ এখনো এমন এক সময়ের বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যখন মানুষের গড় আয়ু ছিল কম এবং পরিবারই ছিল বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তার প্রধান আশ্রয়।
এখন পরিবার ছোট হচ্ছে, সন্তানরা শিক্ষা ও জীবিকার প্রয়োজনে দূরে চলে যাচ্ছে, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বাড়ছে। ফলে প্রবীণদের জীবনে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও একাকিত্ব। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় তাঁদের জন্য নতুন চিন্তা, নতুন ব্যবস্থা এবং নতুন সামাজিক সহায়তার প্রয়োজন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বার্ধক্যকে শুধু অবসর বা কর্মক্ষমতার অবসান হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। একজন মানুষ চাকরি থেকে অবসর নিতে পারেন, কিন্তু তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সামাজিক দক্ষতা ও জীবনের দীর্ঘ অর্জন তো অবসর নেয় না। কৃষক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, শ্রমজীবী কিংবা গৃহিণী, প্রত্যেকেই সমাজ ও পরিবারের জন্য দীর্ঘ সময় অবদান রাখেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ।
তাই প্রবীণদের কেবল ভাতা গ্রহণকারী বা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল মানুষ হিসেবে দেখলে তাঁদের সক্ষমতার বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। যাঁরা সক্ষম ও আগ্রহী, তাঁদের জন্য খণ্ডকালীন কাজ, পরামর্শক ভূমিকা, প্রশিক্ষণ, স্বেচ্ছাসেবা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এতে প্রবীণের আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে, পাশাপাশি সমাজও তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- দীর্ঘ আয়ু
- জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন