উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা
একই মঞ্চ। তিনটি ভিন্ন সময়। তিন প্রজন্মের নেতৃত্ব। আর প্রতিবারই সামনে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন-পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে কীভাবে তুলে ধরা হবে?
১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, নব্বইয়ের দশকে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-জাতিসংঘের মঞ্চে তাদের উপস্থিতিকে শুধু তিনটি পৃথক রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্যের একটি বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। বরং এই তিনটি সময়কে পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অভিযাত্রার তিনটি পৃথক অধ্যায় দেখা যায়-রাষ্ট্রকে আত্মনির্ভর ও আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমান করার চেষ্টা, গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে সংহত করার প্রচেষ্টা এবং পরিবর্তিত বিশ্বে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করে নতুন সক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা।
প্রথম অধ্যায় : রাষ্ট্রের অবস্থান প্রতিষ্ঠা : ১৯৮০-এর বাংলাদেশ ছিল স্বাধীনতার এক দশকও পূর্ণ না করা একটি রাষ্ট্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক পরিসরে অবস্থান সুসংহত করা এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার ভিত্তি তৈরি করা ছিল রাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বৃহত্তর উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করা। ২৬ আগস্ট ১৯৮০ জাতিসংঘের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে তার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বৈষম্যমূলক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন এবং একটি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি।
এর মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতাও প্রতিফলিত হয়েছিল। সদ্য স্বাধীন একটি গরিব রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই পূর্ণ অর্থ বহন করতে পারে, যখন তার সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও যুক্ত হয়। একই চিন্তার আরেকটি প্রকাশ দেখা যায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণায়। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক বিরোধের বাইরে গিয়ে অর্থনীতি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে, এই ধারণাকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ পরবর্তীকালে সার্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় মুল নিয়ামকের ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ সেই সময়ের মূল প্রশ্ন ছিল-বাংলাদেশ কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং বিশ্বব্যবস্থায় নিজের স্বার্থ ও কণ্ঠ প্রতিষ্ঠা করবে?
দ্বিতীয় অধ্যায় : গণতন্ত্র, প্রতিষ্ঠান ও ছোট রাষ্ট্রের অধিকার : ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের বাস্তবতা আবার বদলে যায়। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয় এবং বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন, জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা-গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কার্যকর করা।
১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার বক্তব্যে দারিদ্র্য, সামাজিক উন্নয়ন, শরণার্থী এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহযোগিতার মতো বিষয় উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কার, ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন। এমনকি, ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের পঞ্চাশতম বার্ষিকীর বিশেষ অধিবেশনে তার বক্তব্যে নিরাপত্তা পরিষদসহ জাতিসংঘের প্রধান অঙ্গগুলোর সংস্কার এবং ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের শক্তিশালী ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।
এখানে আগের দশকের সঙ্গে একটি যোগসূত্র স্পষ্ট। জিয়াউর রহমানের সময়ে যে প্রশ্নটি ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ন্যায্য অধিকার, খালেদা জিয়ার সময়ে সেটি আরও বিস্তৃত হয়ে অন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং ছোট রাষ্ট্রের ন্যায্য অবস্থানের প্রশ্নে পৌঁছায়। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে ভাষা ও অগ্রাধিকার বদলেছে, কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত থেকেছে, তা হলো, বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ ও স্বাধীন অবস্থান রক্ষা করা।
তৃতীয় অধ্যায় : পুনর্গঠন থেকে নতুন সক্ষমতার সন্ধান : ২০২৬ সালের বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান এবং পরবর্তী প্রায় দুই বছরের অন্তর্বর্তী অধ্যায়ের পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নতুন সরকারের সামনে তাই শুধু দেশ পরিচালনার স্বাভাবিক দায়িত্ব নয়, একই সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সুসংহত করা এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ভূরাজনীতি
- জাতীয় স্বার্থ
- বিশ্বব্যবস্থা