বৃক্ষমেলার নাগরিক ভাবনা, কেউ শুনবে কি

www.ajkerpatrika.com মৃত্যুঞ্জয় রায় প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৯

জীবনের জন্য উদ্ভিদ—তা সে তৃণ-লতাই হোক বা বৃক্ষ। প্রতিটি সবুজ উদ্ভিদ আমাদের জীবনদাত্রী। হোক তার অবদান যতই ক্ষুদ্র, শেওলা থেকে শিরীষগাছ, সবই আমাদের প্রয়োজন। আনন্দের কথা হলো, এখন সে প্রয়োজন মানুষ ধীরে ধীরে বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। সে কারণে পৃথিবীতে মানুষ যত বাড়ছে, সেসব মানুষও গাছপালা বাড়াতে মনোযোগী হচ্ছে। এ আনন্দের পাশাপাশি একশ্রেণির লোভী মানুষের লোভের শিকার হয়ে কাটাও পড়ছে অনেক গাছ। মানুষ তার প্রয়োজনেও গাছ কাটছে। তারপরও প্রতিটি দেশে বৃক্ষসম্পদ বৃদ্ধির পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ চলছে। অনেক দেশে বৃক্ষরোপণ এখন আন্দোলনে রূপ পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষচারা রোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা এ দেশের বনসৃজন ও উদ্ভিদ সম্পদ বৃদ্ধিতে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।


এ কাজকে ফলপ্রসূ করতে প্রতিবছর এ দেশে বিশাল আকারে জাতীয় বৃক্ষমেলাসহ দেশব্যাপী বৃক্ষমেলার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৯৪ সালে বন বিভাগের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষমেলার সূচনা হয়। বৃক্ষরোপণ অভিযান থেকে শুরু হয় বৃক্ষমেলা। ১৯৯১ সালের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে প্রতিটি নাগরিককে একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানানো হয়। সে বছর ১৩ আগস্ট গাজীপুরের শালনা গ্রামে একটি মেহগনি গাছ রোপণ করে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে তা সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে প্রথম জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষমেলা শুরু হয়। প্রতিবছর তার পরিসর ও আয়োজন বড় হতে হতে বর্তমানে তা এক বৃহৎ উদ্ভিদ উৎসবের রূপ নিয়েছে। প্রতিবছর রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নিয়মিতভাবে জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশের পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষ রোপণে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এত দীর্ঘ সময় ও ব্যাপক আকারে উদ্ভিদ সম্পদের এমন উন্মুক্ত মেলা পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয় বলে জানা নেই।

গত মাসে শেষ হলো এ বছরের জাতীয় বৃক্ষমেলা। বন বিভাগ আয়োজিত মাসব্যাপী সে বৃক্ষমেলা শেষে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে যে এ বছর সে মেলায় মোট ১৬ লাখ গাছের চারা বিক্রি হয়েছে। বিক্রির আর্থিক মূল্য ১৬ কোটি টাকা। এবারের মেলায় মোট ৭৪টি স্টল বা প্রতিষ্ঠান ও নার্সারি অংশ নেয়। গত বছর এই মেলায় ১৫ লাখ গাছের চারা বিক্রি হয়েছিল। গত বছরের তুলনায় এবার ১ লাখ চারা বেশি বিক্রি হয়েছে। বেশ কয়েকবার সে মেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আয়োজন ও গাছপালার সংগ্রহ, নান্দনিক সজ্জা, অসংখ্য উদ্ভিদপ্রেমীর আনন্দময় উপস্থিতি ভালো লেগেছে। পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও মনে এসেছে। বৃক্ষমেলায় তো শুধু বৃক্ষ না, অন্য উদ্ভিদও রয়েছে। তাহলে নাম কেন বৃক্ষমেলা? বন বিভাগ কি বৃক্ষমেলা শেষে শুধু কয়টি চারা বিক্রি হলো, কত টাকার চারা বিক্রি হলো সেগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? প্রতিবছর বৃক্ষমেলায় কী কী নতুন গাছের চারা এ দেশে এল তার তথ্য কে দেবে?


হয়তো বৃক্ষরোপণ অভিযানকে জোরদার করতে বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ রোপণকে গুরুত্ব দিতেই এ নাম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মেলায় যে ১৬ লাখ চারা বিক্রি হয়েছে, সঠিক জরিপ করলে বা তথ্য রাখলে হয়তো দেখা যাবে এর ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই বৃক্ষ না। মেলায় যাঁরা গিয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই নগরবাগানি। তাঁরা বৃক্ষের চেয়ে বেশি কিনেছেন ঘর সাজানো ও ছাদবাগান করার গাছপালা। তাই বন বিভাগ যদি মোট গাছপালা বিক্রির হিসাবের মধ্যে এ তথ্য রাখত, তাহলে তার সঠিক হিসাব জানা যেত যে বিক্রীত উদ্ভিদের কত শতাংশ বৃক্ষ।


যাহোক, এবারের বৃক্ষমেলায় নগর কৃষি ফাউন্ডেশন একটি নাগরিক অভিমত জরিপ পরিচালনা করে। তারা মেলায় আগত প্রায় ২০০ জনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। সে জরিপের ফলাফল হিসেবে দেখা গেছে যে মেলায় আগতদের প্রায় ৯০ শতাংশই ঢাকার বাসিন্দা, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেরই ছাদ, বারান্দা বা ঘরের ভেতরে বাগান আছে। দৃশ্যত দেখা গেছে, অধিকাংশ স্টলে এসব বাগানে লাগানোর উপযোগী চারা প্রদর্শন ও বিক্রি করা হচ্ছে। তাই তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশই তাঁদের পছন্দের চারাটি পেয়ে সন্তুষ্টি নিয়ে ফিরে গেছেন। তাঁদের অনেকে বলেছেন, বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে কিছুটা ছোট পরিসরে হলেও বিশেষ বিশেষ উদ্ভিদের মেলা হতে পারে। যেমন অন্দরবাগানের উদ্ভিদের মেলা, গোলাপ ও অর্কিডের মেলা, বাগানবিলাসের মেলা ইত্যাদি। এ ছাড়া জাতীয় বৃক্ষমেলা সম্পর্কেও তাঁদের কিছু পর্যবেক্ষণ ও অভিমত দিয়েছেন; যেমন—গাছপালার দাম কমানো, চারার মান নিয়ন্ত্রণ করা, কিডস জোন করা, ওয়াশরুম উন্নয়ন, নগরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সফরের আয়োজন করা, নির্দিষ্ট গাছ সম্পর্কে ক্রেতাকে সঠিক তথ্য দেওয়া, স্টল মালিক ও কর্মচারীদের গাছ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা, মেলার ভেতর থেকে বাইরের ফটক পর্যন্ত চারা পরিবহনের জন্য ফ্রি শাটল সার্ভিস বা পরিবহনের ব্যবস্থা করা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নগর কিষান-কিষানিদের জন্য পরামর্শ সেবাকেন্দ্র চালু করা, বৃক্ষমেলার সময় বাড়ানো ইত্যাদি। নাগরিক অভিমতের এসব সুপারিশের মধ্যে কিছু বিষয় অত্যন্ত যৌক্তিক, মেলা কর্তৃপক্ষ সেগুলো চাইলেই করতে পারে।


ইতিমধ্যে ঢাকায় আয়োজিত এ বৃক্ষমেলার খবর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এ দেশের অনেক নার্সারি মালিকেরাও বিদেশের চারা উৎপাদন ও পালনকারী অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে সেসব দেশ থেকে প্রতিবছর নতুন নতুন গাছপালা এনে মেলায় বিক্রি করছেন। এতে জাতীয় মেলাটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে। তাই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের মেলায় অন্য দেশের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত ও অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না তা বিবেচনা করা যেতে পারে। নগরবাগানিরাও চারা উৎপাদক। তাই বইমেলায় যেমন লিটল ম্যাগের পৃথক স্টল রাখা হয়, সেভাবে নগরবাগানিদের জন্য আলাদা একটি জায়গা দিতে পারলে তাঁরাও সেখানে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁদের উৎপাদিত চারা-কলম বিক্রি বা পরস্পর তা বিনিময় করে উপকৃত হতে পারেন, মেলায় আগত অন্য নগরবাগানিদের সঙ্গে তাঁদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারেন।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও