ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বই: ইসলামি আন্দোলন নিয়ে কিছু অনালোচিত প্রশ্ন
আমার পিতার লেখা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস—বইটি নিয়ে আলোচনার একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এবং এ বিষয়ে দলটির ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁর অবস্থানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি এই প্রশ্নটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। দলের ভেতরে এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিমত এবং তাঁর সংস্কার-প্রচেষ্টার বিবরণও সেখানে রয়েছে।
১৯৭১-এর প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আমার পিতার বক্তব্যও ছিল স্পষ্ট। কিন্তু কেবল এই একটি প্রসঙ্গের আলোকে বইটিকে মূল্যায়ন করলে এর বৃহত্তর বক্তব্য আড়ালে থেকে যায়। বিশেষ করে বইয়ের শেষ দিকের অধ্যায়গুলোতে তিনি ইসলামি আন্দোলনের উদ্দেশ্য, ইসলামি রাজনৈতিক দলের ভূমিকা, সমাজের ইসলামায়নের বিকল্প পথ এবং দাওয়াহ ও রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে যেসব প্রশ্ন তুলেছেন, সেগুলো যথেষ্ট আলোচিত হয়নি। অথচ বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো অর্থবহ আলোচনা করতে হলে এসব বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বইয়ের প্রথম তিন অধ্যায়ে আমার পিতা জামায়াতে ইসলামীর দর্শন, সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ১৯৫৭ সালে পাঞ্জাবের মাছিগোঠে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে দলটির রাজনৈতিক সংকট পর্যন্ত তিনি একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের পক্ষে তাঁর আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন রক্ষার সাংবিধানিক মামলা সম্পর্কেও লিখেছেন।
এসব অধ্যায় থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দলটির গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও রাজনৈতিক সংকটগুলোর সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার পরিচয় পাওয়া যায়। তবে বইটির সবচেয়ে উপেক্ষিত, অথচ চিন্তার খোরাক জোগানো অংশটি শুরু হয়েছে পঞ্চম অধ্যায় থেকে। সেখানে তিনি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: ইসলামি আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইসলামি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা বা তাতে যোগদান করা কি অপরিহার্য?
২.
বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক দল ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে। আমার পিতা এই ধারণাটিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, ইসলামি জাগরণ কেবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না। দাওয়াহকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, দাঈদের প্রশিক্ষণ, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, গণমাধ্যমের মাধ্যমে ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মধ্য দিয়েও ইসলামি আন্দোলনের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হতে পারে।
মুহাম্মদ আসাদ, হাসান আল-বান্না, ইউসুফ আল-কারযাভী, হাশিম কামালিসহ বিভিন্ন ইসলামি চিন্তাবিদের মতামত পর্যালোচনা করে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিজেই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; বরং সমাজে আল্লাহর বিধান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর উদ্দেশ্য অর্জনের একটি সম্ভাব্য মাধ্যম মাত্র। মাধ্যমকে যদি উদ্দেশ্যের সমতুল্য করে দেখা হয়, তাহলে ইসলামি আন্দোলনের পরিধি অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এই আলোচনা থেকে একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জাগে। একজন মুসলমানকে কি তাঁর ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের জন্য আবশ্যিকভাবে কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে হবে? নাকি তিনি অন্য কোনোভাবে সমাজে ন্যায়, নৈতিকতা ও ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখে একই দায়িত্ব পালন করতে পারেন?
এ ক্ষেত্রে আমার পিতার উত্তর ছিল উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। তাঁর মতে, সমাজের ইসলামীকরণের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ একটি নয়, বরং অনেক। ইসলামি রাজনৈতিক দলে যোগদান সেই পথগুলোর একটি হতে পারে, কিন্তু এটিই একমাত্র পথ নয়। কোনো বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, গবেষক বা দাঈ রাজনৈতিক দলে যোগদান না করলেই তাঁকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করার কারণ নেই। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে তাঁরাও ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে সমাজে ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পারেন। ইসলামি আন্দোলনের এই বিস্তৃত ধারণাটি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে।