নারীর ওপর নারীদেরই অদৃশ্য আঘাত
আমাদের সমাজ যেভাবে শৈশব থেকেই ছেলেদের ‘রাগী’, ‘পুরুষ’ বা ‘আবেগহীন’ হতে শেখায়, তা কীভাবে একসময় তাদের ‘টক্সিক মাস্কুলিনিটি’ বা ‘বিষাক্ত মর্দানি’তে রূপ নেয়—তা আমাদের সবারই জানা। সমাজ তাদের ক্রমাগত শেখায়, পুরুষত্ব প্রমাণের তরিকা হলো রাগারাগি-মারামারি করা, নারীর ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রমাণ করা এবং মানবিক গুণগুলো দমিয়ে রেখে কিংবা ধ্বংস করে কেবল ‘পুরুষ’ হিসেবে আমৃত্যু বেঁচে থাকা।
নারীদের গায়ে হাত তোলার পর কীভাবে পুরুষেরা নিজেদের অপরাধকে ‘ন্যায্য’ কিংবা ‘ধর্মসম্মত’ হিসেবে জাহির করতে নানামুখী ফন্দিফিকির করে—তা নিয়ে আমরা বারবার আলোচনা করেছি। পাশাপাশি, কীভাবে আড্ডার ছলে পরিচিত-অপরিচিত নারী বন্ধু বা সহকর্মীদের চরিত্রহনন করে বহু পুরুষ প্রতিদিন নিজেদের আনন্দ জোগায়, সেই চিত্রও তুলে ধরেছি।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বেশির ভাগ পুরুষের মনে এমন একটি ধারণা তৈরি করে যে তাঁরা নারীদের কাছ থেকে সেবা, মনোযোগ, ভালোবাসা, যৌনতা ও সম্মান পাওয়ার অধিকারী। যখন নারীরা তা দিতে অস্বীকৃতি জানান বা উল্টো নিজের অধিকার দাবি করেন, তখন তাঁরা নিজ সঙ্গী বা স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক ও মানসিক আক্রমণের শিকার হন, যার প্রতিফলন আমরা প্রতিবছরের পরিসংখ্যানগুলোতে দেখতে পাই।
- পুরুষতান্ত্রিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও ক্ষমতার সম্পর্ককে আত্মস্থ করে, আবার অন্য নারীর ওপর সেই রীতিনীতি প্রয়োগের চেষ্টায় তাঁদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠলাম কি না, তা কি কখনো চিন্তা করেছি?
- যখনই কোনো নারী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি করা নিয়ম ভাঙতে যান, তখনই এই ‘পুলিশি ব্যবস্থা’ তাঁকে নানাভাবে শাস্তি দেয়, অপমান করে বা দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
- পুরুষতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো কীভাবে নারী ও পুরুষ—উভয়ের কার্যকলাপের মাধ্যমে পুনরুৎপাদিত হয় এবং নারীর প্রতি সহিংসতার নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, সে বিষয়েও আরও বেশি আলাপ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।
উল্লেখ্য, এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী নির্যাতনের অভিযোগে জরুরি সেবায় যে ২৭ হাজার ৯১১টি অভিযোগ এসেছে, এর মধ্যে ৬২ শতাংশ নির্যাতনের অভিযোগই স্বামী বা সঙ্গীর বিরুদ্ধে।
কিন্তু এই ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা’ কীভাবে আমাদের আশপাশের নারীদেরও অবধারিতভাবে প্রভাবিত করে এবং সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতাকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে প্রস্তুত করে, তা নিয়েও কথা বলা দরকার। নারীর প্রতি পুরুষের শারীরিক, মানসিক বা অর্থনৈতিক সহিংসতার পর ভিকটিম নারীর এই অপরাধগুলো মেনে নেওয়া, ‘পারিবারিক সম্মানের’ নামে গোপন করা বা নারীকেই দোষারোপ করে এই অপরাধগুলোকে সামাজিকভাবে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রক্রিয়াতে পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে অন্য নারীরাও সচেতন ও অবচেতনভাবে ভূমিকা রেখে থাকেন।
এই যে পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে নারীরাও কীভাবে পুরুষতন্ত্রের রীতিনীতিগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত করে চলেছেন, তা নিয়েই কয়েকটি কথা বলা যাক আজ।
ভেবে দেখুন, ছোটবেলা থেকে আমরা কী কী দেখে ও শুনে বড় হতে থাকি। এই যেমন ধরুন, ‘ছেলেদের একটু রাগ বেশিই হয়’ কিংবা ‘মেয়েদের একটু ধৈর্য বেশিই থাকতে হয় বা মানিয়ে চলতে হয়’, এই কথাগুলো কখনো শোনেনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আবার ধরুন, ছোটবেলায় ছেলেশিশুকে বন্দুক-রাইফেল উপহার দেওয়া আর মেয়েশিশুকে বার্বি ও কিচেন সেট দেওয়ার প্রচলন গড়ে উঠেছে বহুকাল ধরে!
একটা শিশু বুঝে ওঠার আগেই সমাজ পছন্দসই লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা তার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ছেলেশিশুকে শেখাচ্ছে ‘মেয়েদের মতো’ করে না কাঁদতে আর মেয়েদের শেখাচ্ছে ‘ছেলেদের মতো’ করে পা ছড়িয়ে না বসতে কিংবা জোরে না হাসতে।
সমাজের চোখে এই ‘ভালো মেয়ে’ হওয়ার চেষ্টায় অবচেতনভাবে আমরা নিজেদের মানুষ না ভেবে ক্রমে ‘মেয়েমানুষ’ই ভেবে গেলাম। পুরুষতান্ত্রিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও ক্ষমতার সম্পর্ককে আত্মস্থ করে, আবার অন্য নারীর ওপর সেই রীতিনীতি প্রয়োগের চেষ্টায় তাঁদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠলাম কি না, তা কি কখনো চিন্তা করেছি?