ঘরে ঘরে যখন জ্বর, তখন কীভাবে বুঝব কোনটা জটিল আর কোনটায় শঙ্কা নেই
মৌসুম বদলের এই সময় ঘরে ঘরে জ্বর। কারও ডেঙ্গু, কারও চিকুনগুনিয়া, কারও হাম, কারও আবার সাধারণ ফ্লু। বেশির ভাগ জ্বর কয়েক দিনের ভোগান্তির পর সেরে গেলেও কারও কারও কিন্তু বিপদ নেমে আসছে। কাউকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে, কারও কারও আবার মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে।
কে যে সহজেই সেরে উঠবেন, আর কার জটিলতা দেখা দেবে—শুরুতে তা বোঝা মুশকিল। যেহেতু ‘জ্বর’ নিজে কোনো রোগ নয়, রোগের উপসর্গমাত্র; তাই ভেতরের গল্পটা রোগীভেদে ভিন্ন।
জ্বরের তীব্রতা ও স্থায়িত্বকাল, রোগীর বয়স, নারীদের গর্ভকালীন সময়, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, সাম্প্রতিক ভ্রমণ ইতিহাস প্রভৃতি পর্যালোচনার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা তাই জরুরি। আর সেই সঙ্গেই জরুরি সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং।
জ্বর হলেই আতঙ্ক নয়, তবে ‘আরেকটু দেখি’ বা ‘এ আর এমন কি’—এমনটা ভেবে অবহেলা করাও অনুচিত। কেননা জ্বরের পেছনে থাকতে পারে ফ্লু, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া, প্রস্রাবে ইনফেকশন, মস্তিষ্কে প্রদাহ, হেপাটাইটিস থেকে শুরু করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুরুতর সংক্রামক ব্যাধিও।
নানা কারণে এখন জ্বর
- এ বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণের ধরনে কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয় হচ্ছে। উচ্চমাত্রার জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও গিরাব্যথা, বমিভাব, র্যাশ ইত্যাদি থাকতে পারে। কিন্তু ডেঙ্গুর সবচেয়ে সংকটের সময়টি হলো জ্বর সেরে যাওয়ার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা। এ সময় কিছু রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে, দেখা দিতে পারে নানা জটিলতা। তাই বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট, পেটব্যথা, পাতলা পায়খানা, রক্তপাত, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, পানিশূন্যতা ইত্যাদি ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণগুলো খেয়াল রাখতে হবে। এসবে ভুগতে থাকলে বাড়িতে বসে না থেকে অবশ্যই হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। সাধারণত ডেঙ্গুতে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রয়োজন নেই, প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য যেকোনো ব্যথানাশক ওষুধ বা স্টেরয়েড সেবন করাটাও বরং বিপজ্জনক। এ সময় পর্যাপ্ত পানি ও তরল খেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের সিবিসি, হিমাটোক্রিট, এসজিপিটি ইত্যাদি মনিটরিং করতে হবে। আনুষঙ্গিক চিকিৎসাব্যবস্থাও মেনে চলতে হবে।
- চিকুনগুনিয়াতে জ্বরের সঙ্গে তীব্র জয়েন্টের ব্যথা ও প্রদাহ থাকে। হাত-পায়ের জয়েন্ট ফুলে যেতে পারে, হাঁটাচলা, এমনকি নড়াচড়া করতেও কষ্ট হয়। মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, র্যাশ ও দুর্বলতা থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে জয়েন্টের ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কখনো দেখা যায়, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর বাতরোগ ধরা পড়ে এবং তা স্থায়ী হয়ে যায়। তাই এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলোআপ প্রয়োজন। চিকুনগুনিয়া হলে রোগীর কষ্ট এবং ব্যথা তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি হয় কিন্তু এতে ডেঙ্গুর মতো জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা কম।
- ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা সাধারণত হঠাৎ জ্বর, দুর্বলতা, সর্দি-কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা এবং সারা শরীরে ব্যথা দিয়ে শুরু হয়। উপসর্গভিত্তিক সহায়ক চিকিৎসার মাধ্যমে বেশির ভাগ মানুষ কয়েক দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ফ্লু মানেই সব সময় হেলাফেলার বিষয় নয়। যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, যেমন শিশু, বৃদ্ধ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, কিডনির রোগ, ক্যানসার বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে যাঁরা ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ফ্লু থেকে নিউমোনিয়া বা গুরুতর সংক্রমণও হতে পারে। সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে গিয়ে সেপসিস হয়ে যেতে পারে। তাই সব সময় এটিকে ‘সাধারণ জ্বর’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।