সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী: হিন্দু পরিবার কী সুফল পাবে
সুবোধ রায় ও রাসমণি দেবীর দুই ছেলে, দুই মেয়ে। এই দম্পতির মৃত্যুর পর তাঁদের সম্পত্তির মালিক হন দুই ছেলে। মেয়েরা কোনো সম্পত্তি পাননি। হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, ছেলে থাকলে পারিবারিক সম্পত্তিতে মেয়েদের কোনো অধিকার থাকে না।
সম্প্রতি কথা হয় দুই মেয়ের একজন, সুবর্ণা দেবীর সঙ্গে। তিনি বললেন, মা–বাবা অবস্থাপন্ন ঘর দেখে তাঁদের দুই বোনকে বিয়ে দিয়েছিলেন। ভালোই চলছিল। তবে বিপত্তি ঘটে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হলে। তখন তাঁর ছোট ছোট তিন সন্তান। স্বামীর সম্পত্তি ভোগ করার জীবনস্বত্ব পেয়েছেন, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু প্রয়োজন (তীর্থে যাওয়া, মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা ব্যয়) ছাড়া বিক্রি করার অধিকার তাঁর নেই।
বড় ধরনের আর্থিক প্রয়োজন হলে সুবর্ণা দেবীকে ভাই কিংবা স্বজনদের মুখাপেক্ষী হতে হয়। বাবা কিংবা স্বামীর সম্পত্তিতে তাঁর যদি মালিকানা থাকত, তাহলে তিনি বিক্রি করে নিজের প্রয়োজন নিজেই মেটাতে পারতেন। সব মিলিয়ে জীবনটা অনেক বেশি সম্মানের হতো বলে তিনি মনে করেন।
সুবর্ণা দেবীর দুই ভাই। সুহাস রায় ও সুভাষ রায়। সুহাসের দুই ছেলে, সুভাষের দুই মেয়ে। যাঁর ছেলেসন্তান আছে, সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে জটিলতা নেই। তবে যাঁর দুই মেয়ে, তিনি কিছুটা দ্বিধান্বিত। সুভাষ রায় একবার ভাবেন, সম্পত্তি দুই মেয়েকে লিখে দেবেন, বোনদের মতো যেন মেয়েদের ভুগতে না হয়। আবার ভাবেন, লিখে দিলে তো দিয়েই ফেললেন। সম্পত্তি পেয়ে মেয়ে-জামাতারা যদি তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে না দেখেন! তখন তো শেষ বয়সে উল্টো মানবেতর জীবন কাটাতে হবে তাঁদের।
হিন্দু পরিবারের যাঁরা সুভাষ রায়ের মতো দ্বিধা-দুশ্চিন্তায় আছেন, তাঁদের জন্য আশার আলো হতে পারে সম্পত্তি হস্তান্তরের সংশোধিত আইনটি। সম্পত্তি দান করার পর দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন—এমন বিধান রেখে ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় ১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল।
কী প্রচলিত আছে, কী হতে পারে
বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি বণ্টন হয়ে থাকে দায়ভাগ মতবাদ অনুসারে। পরিবারে ছেলেসন্তান থাকলে তিনি বা তাঁরাই সম্পত্তির উত্তরাধিকার হন। ছেলে না থাকলে বিধবা স্ত্রী ও মেয়েরা জীবনস্বত্ব পান। তাঁদের মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন হয়।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের যে সংশোধনী আনা হলো, এতে আসলে কী হবে—জানতে চেয়েছিলাম সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কর্মকারের কাছে। তিনি বলেন, সম্পত্তি বণ্টনের জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর যে পারিবারিক আইন আছে, সেগুলো বহাল থাকবে। সেসব আইনে তাঁরা সম্পত্তির বণ্টন করতে পারবেন। এর বাইরে এটি নতুন একটি সংযোজন, সব নাগরিক এর সুবিধা পাবেন। কেউ যদি ছেলে ও মেয়েকে নিজের ভোগাধিকার রেখে দান করতে চান, তাহলে তাঁর পথ সহজ হলো।
এই আইনজীবী বলেন, হিন্দু পরিবারে বাবা চাইলে মেয়েকে সম্পত্তি দান করতে পারেন। উইল করতে পারেন। দান করার পর মেয়ে যদি তাঁর দেখভাল না করেন, সে ক্ষেত্রে দানপত্র বাতিল করার সুযোগ তাঁর আছে। রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে তিনি কাজটি করতে পারেন।
তবে আইনের বিষয়গুলো ভালোভাবে না জানার কারণে জটিলতা তৈরি হয়। আর উইলের ক্ষেত্রে দাতার মৃত্যুর পর গ্রহীতাকে আদালতে গিয়ে দখল বুঝে নিতে হয়। এসব জটিলতা থেকে সুরক্ষা দেবে আইনটি। কারণ, এটি দাতা বেঁচে থাকা পর্যন্ত সম্পত্তিতে তাঁর স্বত্ব নিশ্চিত করে। আর রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দানপত্র করে দিলে দাতার মৃত্যুর পর আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন নেই।