অপ্রতিম যে প্রশ্নগুলো রেখে গেল আমাদের সামনে
আজকের লেখায় প্যারেন্টিং নিয়ে কিছু বলতে চাইছি না, বা বলতে চাইছি না অপ্রতিমকে বড় করার ক্ষেত্রে কী ঠিক বা ভুল ছিল। সন্তান হারানোর বেদনার চেয়ে মা-বাবার কাছে আর কোনো বড় বেদনা হতে পারে না।
কারও সন্তান এভাবে চলে গেলে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার—সবাইকে দায়ী করা যায়। কিন্তু এই চলে যাওয়াতে রাষ্ট্র বা সমাজের কতটুকু ক্ষতি হয় জানি না, কিন্তু মা-বাবা শূন্য হয়ে যান। তাঁরা বেঁচে থেকেও আসলে মারা যান।
সেই সত্তরের দশকে, সেন্ট্রাল রোডে আমাদের পাড়ার মিলন গুন্ডার হাতে নিহত হলো আলম গুন্ডা। তার মরদেহ যখন বাসার সামনে আনা হলো, তখন আলমের মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। জ্ঞান ফেরার পর চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলেন, ”বাপরে, তুই ফিরা আয়। গুন্ডা-বদমাইশ যাই হইস, তুই ফিরা আয়। তোরে ছাড়া মা বাঁচবো কেমনে?”
বয়স কম হলেও, আমি ওই কান্না দেখে সেদিন অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, একজন গুন্ডার জন্য মা কেন কাঁদবেন? আম্মা বলেছিল, ”মায়ের কাছে সন্তানের চাইতে দামি কিছু নাই, সন্তানের কোনো দোষ থাকে না।” তাই হয়তো সত্য।
নিজে মা হওয়ার পর ভালোভাবে বুঝতে পারি, পরিবারের শিশুটি হারিয়ে গেলে পরিবারটিও ছারখার হয়ে যায়। অপ্রতিম একা নয়, গত আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ১৫৫ জন শিশু নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অন্যান্য ঘটনায় নিহত হয়েছে। ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। (আইন ও সালিশ কেন্দ্র)
”আইফোন, টিকটক, টাকার বাটোয়ারা এবং অসম বন্ধুত্বের” জন্য যে এই শিশুরা নিহত হয়েছে, তা কিন্তু নয়। শিশুদের ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু এবং স্বজনের হাতে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হত্যার কোনো কোনো ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে পরিচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
এইভাবে যদি শিশুমৃত্যুর হার বাড়তে থাকে, শুধু একটি পরিবার নয়, একদিন সমাজ, দেশ—সব ভেঙে পড়বে। তখন হয়তো আর ফিরে আসার পথ থাকবে না।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর অনেক ধরনের তথ্য সামনে আসছে, নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে সামাজিকমাধ্যমে ও মূলধারার মিডিয়াতে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, টিনএজ বা বয়ঃসন্ধিকালের সন্তান সবার ঘরে আছে। এই সময়টায় তাদের হ্যান্ডেল করাটা যে কতটা কঠিন, বিশেষ করে আজকের এই সমাজে, তা সবাই কম-বেশি জানেন বা বুঝতে পারেন। তাই চট করে কাউকে দায়ী করা বা প্যারেন্টিং নিয়ে মন্তব্য করাটা সমুচিত নয়।
অপ্রতিমের চলাফেরা, পছন্দ ও বন্ধুত্ব নিয়ে কথা থাকতে পারে। ওর ফেসবুক এবং টিকটক অ্যাকাউন্ট গোপন কিছু নয়। তবে টিকটক, বাইক, আইফোন—এগুলো কোনোটাই ছেলেটার মৃত্যুর জন্য দায়ী নয়। আর এগুলোর কোনোটাই তার হত্যাকে জাস্টিফাই করে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মরদেহ উদ্ধার
- শিশু নিখোঁজ