সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির আত্মহননের ঘটনা কোনো কোনো সংবাদপত্রে সিঙ্গেল কলাম খবর হয়েছিল। তিনি কয়েক দিন আলোচনার খোরাক হয়েছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যে দৈনিক পত্রিকা থেকে তিনি চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন, সেই ‘সমকাল’ কর্তৃপক্ষ অবশেষে তার পাওনা পরিশোধ করেছে। পুলক চ্যাটার্জি চাকরি হারান তিন বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়েও কর্তৃপক্ষ তার পাওনার হিসাব শেষ করতে পারেনি। পুলক চ্যাটার্জি তার জীবন নিজ থেকে শেষ করে দেওয়ার পর পত্রিকাটির কর্তৃপক্ষ হিসাব সম্পন্ন করে। পুলকের পাওনা পরিশোধের বিষয়টি সংবাদপত্রে ছোট করে খবর হয়েছে। পুলক আর সংবাদপত্রের খবর হবেন না, সামাজিক মাধ্যমে সাংবাদিকসহ বিভিন্নজনের মন্তব্যের খোরাকও হবেন না।
পুলক চ্যাটার্জিকে এখন তার পরিবার আর একান্ত ঘনিষ্ঠজন ছাড়া কেউ মনেও রাখবে না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতা ‘কেউ কথা রাখেনি’ স্মরণে এনে বলতে হয়, কেউ মনেও রাখে না। যেমন কেউ মনে রাখেনি আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া আরেক সাংবাদিক ও কলামনিস্ট বিভুরঞ্জন সরকারকে। জীবন এবং পেশার পড়ন্ত বেলায় চরম হতাশা থেকে তিনিও আত্মহননের পথ বেছে নেন।
পুলক চ্যাটার্জির আত্মহত্যার পর প্রাসঙ্গিকভাবে বিভুরঞ্জন সরকারের নাম আবার সামনে আসে। না হলে তিনি চলে গিয়েছিলেন বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। পুলক এবং বিভুরঞ্জনের আত্মহনন সাংবাদিকতা পেশার অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের অসহায়ত্বকে নগ্নভাবে তুলে ধরে। শুধু আত্মহত্যা নয়, বিভিন্ন সময় দেশে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অনেক সাংবাদিক। নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন সাংবাদিক দম্পতিও। পুলক চ্যাটার্জির আত্মহত্যার ঘটনা মিডিয়াকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও পেশা হিসেবে সাংবাদিকতায় জীবিকার নিশ্চয়তা নেই। নিয়মিত বেতন না পাওয়া, চাকরি ছেড়ে দিলে অথবা চাকরিচ্যুত হলে পাওনা না পাওয়া —এই পেশার সাধারণ বিষয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হয় না। নেই প্রভিডেন্ট ফান্ড। মাত্র কয়েকটি সংবাদপত্র এবং দুই-একটি টিভি চ্যানেল ছাড়া গ্র্যাচুইটি নেই। সাংবাদিকদের বেতন না বাড়লেও প্রতিবছর তাদের সন্তানদের স্কুল-কলেজে বেতন বাড়ে। প্রতিবছর না হলেও দুই-তিন বছর পর পর বাড়ে বাড়িভাড়া। নিত্যপণ্যের দামও বাড়ে। অথচ একই বেতন বছরের পর বছর নির্দিষ্ট অংকের ঘরে স্থির হয়ে থাকে।
বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি
সাংবাদিকতা পেশার অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনেক সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। খুলনা বিভাগে বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘পত্রদূত’ পত্রিকার সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা স. ম. আলাউদ্দিন ১৯৯৬ সালের জুন মাসে ঘাতকের গুলিতে নিহত হন। তিনি সে সময় পত্রিকা অফিসে কর্মরত ছিলেন। ওই অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক শামছুর রহমান ২০০০ সালের ১৬ জুলাই যশোরে নিজের অফিসে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তিনি দৈনিক জনকণ্ঠের যশোর অফিস থেকে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। ঘনিষ্ঠজনের কাছে কেবল নামে পরিচিত শামছুর রহমান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি এবং সীমান্ত এলাকার চোরাচালান নিয়ে সাহসী প্রতিবেদন তৈরি করতেন। তাকে হত্যার পর ধারণা করা হয়েছিল, তিনি পেশাগত কারণেই চরমপন্থি ও অপরাধচক্রের টার্গেট হয়েছিলেন। যশোরের আরও একজন সাংবাদিক সাইফুল আলম মুকুল ১৯৯৮ সালের ৩০ অগাস্ট বোমা হামলায় নিহত হন। তিনি স্থানীয় দৈনিক ‘রানার’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। খুলনার বিশিষ্ট সাংবাদিক মানিক সাহা ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি চরমপন্থিদের বোমা হামলায় নিহত হন। মানিক সাহা ওইদিন খুলনা প্রেসক্লাব থেকে রিকশায় বাড়ি ফেরার পথে তাকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। বোমার আঘাতে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। দেখা যাচ্ছে খুলনা-যশোর অঞ্চলে কয়েক বছরের ব্যবধানে চারজন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এই চার সাংবাদিক হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচার আজও শেষ হয়নি।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড এখনো আলোচনায় রয়ে গেছে। এর কারণ দীর্ঘ ১৪ বছরেও এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ১২৯ বারেরও বেশি পিছানো হয়েছে। পুলিশ, ডিবি ও র্যাবের পর পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব পেলেও এখনো হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেনি। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের নিউজ এডিটর সাগর সারওয়ার এবং এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি দম্পতি নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন।