বাংলাদেশের সামনে বিরল কূটনৈতিক সুযোগ
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন প্রতিবছরই আসে। রাষ্ট্রনেতারা নিউইয়র্কে যান, ভাষণ দেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন, কিছু প্রস্তাব পাস হয়, অনেক প্রতিশ্রুতিও উচ্চারিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এবারের ৮১তম অধিবেশনকে সেই পরিচিত ছকে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, এবারের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ ২২–২৯ সেপ্টেম্বর, সাধারণ বিতর্ক চলবে ২২–২৬ ও ২৮ সেপ্টেম্বর। এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন সামলানো এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ গড়ে তোলা’।
বাংলাদেশের একজন নাগরিকের সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব নিঃসন্দেহে বিরল কূটনৈতিক অর্জন। ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী পান ৯১ ভোট। ফলে এটি কেবল আঞ্চলিক পালাবদলের আনুষ্ঠানিক ফল ছিল না, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে অর্জিত একটি পদ।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা বোঝা দরকার। সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অধিবেশন পরিচালনা করেন না, তিনি ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের সাধারণ পরিষদের সভাপতি। তাঁকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হয়, ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করতে হয় এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনার জায়গা তৈরি করতে হয়।
ফলে এই পদকে বাংলাদেশের জাতীয় দাবি আদায়ের সরাসরি হাতিয়ার হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এর বড় মূল্য অন্যত্র—বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে অস্বাভাবিকভাবে দৃশ্যমান। ঢাকা যদি এই দৃশ্যমানতাকে পরিণত, সংযত ও পরিকল্পিত কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য একটি ‘কূটনৈতিক জানালা’ খুলে দিতে পারে।
এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে ফিরে আসা উচিত রোহিঙ্গা সংকট। তবে শুধু ‘রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে’—এই পরিচিত বাক্যে আটকে থাকলে চলবে না। ৮ বছরের বেশি সময় ধরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বহন করার পর বাংলাদেশের এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন—প্রত্যাবাসনের বাস্তব কর্মপরিকল্পনা কোথায়?
রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব কার? মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কেন ক্রমেই অনিশ্চিত হচ্ছে? এবং এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, মানব পাচার, অপরাধ ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মূল্য কে বহন করবে?
গত বছরের ৮০তম অধিবেশনেই রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন করেছিল এবং স্বীকার করেছিল যে বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকাল এই বোঝা বহন করতে পারে না। এই স্বীকৃতিকে এবার ঘোষণার স্তর থেকে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপে নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের বক্তব্য হওয়া উচিত মানবিক কিন্তু দৃঢ়—প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই হতে হবে, কিন্তু ‘পরিস্থিতি অনুকূল নয়’ কথাটি যেন স্থায়ী অজুহাতে পরিণত না হয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- কূটনৈতিক তৎপরতা