পরীক্ষা ভিত্তিক রোল নম্বর কি শিশুদের শেখাকে আনন্দদায়ক করে?
প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো, শিশুদের শেখার আনন্দ ধরিয়ে দেওয়া, নিজেদের মতো করে ভাবতে শেখা, দলগতভাবে শেখার আনন্দ উপভোগ করতে দেওয়া, টিম ওয়ার্ক শেখানো, মানবিক ও সহনশীল হতে শেখানো।
শিশু যদি পাঠে আনন্দ না পায়, শিখতে আনন্দ না পায়, তাহলে পড়াশোনার প্রতি ধীরে ধীরে তার ভেতরে অনীহা জাগতে শুরু করে। শিশুরাও খুব অল্প বয়স থেকেই সেই অনীহা লুকিয়ে রাখতে শিখে যায়, যখন সে দেখে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সেই অনীহা প্রকাশকে খারাপভাবে দেখা হয়।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা খুবই মানসিক চাপের। তাদের শৈশব থেকেই চাপ দেওয়া হয়। ক্লাসের রোল নম্বর প্রথম দিকে থাকতে হবে। পাঠের আনন্দ দেওয়া, সৃষ্টিশীলতা জাগিয়ে তোলা আর রোল নম্বর এক হওয়া–এই বিষয়গুলো কিন্তু আলাদা।
শিশু যখন বুঝতে পারে, সে বেশি নম্বর পেলে, রোল নম্বরের তালিকায় প্রথম দিকে থাকলে, পরিবার খুশি হয়, স্কুলের শিক্ষকদের আলাদা এটেনশন পাওয়া যায়, তখন তার লক্ষ্য আর পাঠের আনন্দ থাকে না। সে খুব সহজেই মুখস্থ করতে শুরু করে। শিশুদের মুখস্থ করার ক্ষমতা থাকে অসাধারণ।
শিশুরা যখন মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা গ্রহণ করে, তখন তাদের সৃষ্টিশীলতা কমে। তাদের ভাবনার শক্তি কমে। এটা গবেষণালব্ধ কথা। শিশুদের ভাবনার শক্তি বা প্রখরতা কমলে সে কৈশোর-যৌবনে ক্রিটিক্যাল থিংকিং, উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি ইত্যাদিতে আগ্রহ হারাতে পারে।
গবেষণা করে এটাও দেখা যায় যে, শিশু নিজেকে কেমন ভাবে, সেটা তার প্রকৃত দক্ষতার চেয়ে বেশি নির্ভর করে ক্লাসে তার আপেক্ষিক অবস্থানের ওপর।
সেলফ ডিটারমিনেশন বা আত্মপ্রত্যয় থিউরিতে দেখানো হয়েছে, পারিপার্শ্বিকতা থেকে চাপানো পুরস্কার (যেমন রোল নম্বর ভালো করা বা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা) আর অন্যের সাথে তুলনা ইত্যাদি শেখার ভেতরের আগ্রহকে ক্ষয় করে দেয়।
পৃথিবীর বহু দেশের স্কুলে এই ধরনের ক্রমতালিকা বা রোল নম্বর নেই। রোল নম্বর থাকা যে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর, সেটা দুনিয়ার বহু গবেষক অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাদের সেই গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে অনেক দেশ এই পদ্ধতি বাদ দিয়েছে।
উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর জাতীয় পাঠ্যক্রমে স্পষ্ট করে লেখা আছে, নিচের শ্রেণিতে মূল্যায়নের কাজ শিশুকে সাহায্য করা—শিশুদের পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করে সাজিয়ে দেওয়া নয়।
ফিনল্যান্ডে স্কুল বা শিক্ষকেরও র্যাঙ্কিং (ক্রম তালিকা) প্রকাশ করা হয় না। কারণ নীতিগতভাবেই ধরে নেওয়া হয় যে মূল্যায়নের ফল দিয়ে কাউকে চিহ্নিত করে দেওয়া উচিত না।
রোল নম্বরের বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি
বোর্ড বা জেলা থেকে প্রতিটা গ্রেডের (ক্লাসের) জন্য গাইডলাইন রাখা জরুরি। ন্যূনতম কতটুকু যোগ্যতা প্রতিটা শিশুর থাকা উচিত, সেটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তারপর প্রত্যেকের কাজের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষকরা মতামত বা মন্তব্য বা গ্রেডও করতে পারবেন। পাঠে যারা পিছিয়ে পড়ে তাদের টেনে তোলার জন্য শিক্ষকদের ফোকাস থাকে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মূল্যায়ন
- প্রাথমিক শিক্ষা