শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাশ্রম নবদিগন্তের সূচনা করবে
একটি জাতির জীবনে তরুণ ও যুবসমাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যে জাতি তার যুবসমাজকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে না, সে জাতি কখনোই বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। তাই সব দেশের সরকারকেই ভাবতে হবে কীভাবে তার তরুণ ও যুবসমাজকে দেশ ও জাতির কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা খুবই জরুরি। আমাদের দেশে ‘সামার ভ্যাকেশন’ বা গ্রীষ্মকালীন ছুটির ব্যাপ্তি প্রায় দেড় মাস। এ সময় শিক্ষার্থীরা সাধারণত কর্মহীন জীবনযাপন করে। গ্রীষ্মকালীন ছুটি এলেই বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ক্যাম্পাস অনেকটাই নীরব এবং শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ে। লেখাপড়ার কঠিন দায়িত্ব থেকে শিক্ষার্থীরা সাময়িক মুক্তি লাভ করে। এ সময় তারা গ্রামের বাড়িতে অথবা অন্য কোথাও চলে যায়।
তারুণ্য মানেই অফুরন্ত জীবনীশক্তি ও সম্ভাবনাময় নতুন কিছু করার উদ্দীপনা। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যদি গ্রীষ্মকালীন ছুটির দিনগুলোতে স্বেচ্ছাশ্রম বা অন্য কোনো কাজে নিয়োজিত করা যায়, তাহলে দেশ যেমন উপকৃত হবে, শিক্ষার্থীরাও নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারবে। শিক্ষাজীবনে ছুটি মানেই কেবল অফুরন্ত বিশ্রাম নয়, বরং নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার এক সুবর্ণ সুযোগ। গ্রীষ্মকালীন দীর্ঘ ছুটির সময় শিক্ষার্থীরা যখন ক্লাসরুমের বাইরে থাকে, তখন তাদের মেধা ও সময়কে যদি স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যবহার করা যায়, তাহলে দেশ লাভবান হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও তাদের অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে পারবে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, দেশে উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। মাদ্রাসা (আলিম পর্যায়) পর্যায়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ লাখের মতো। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের বেশির ভাগই গ্রীষ্মের ছুটির সময় তেমন কোনো উৎপাদনমুখী কাজ করে না। ফলে একদিকে যেমন শ্রমশক্তির অপচয় ঘটে, তেমনি শিক্ষার্থীরাও বাস্তব জীবন সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে। অথচ এ সময় শিক্ষার্থীদের উৎপাদনমুখী কাজে নিয়োজিত করার চমৎকার সুযোগ রয়েছে; ছাত্রছাত্রীদের জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তারা যদি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে অবহিত হতে না পারে, তাহলে তাদের অর্জিত জ্ঞান ও শিক্ষা অসমাপ্ত থেকে যাবে। সামার ভ্যাকেশনের এ নাতিদীর্ঘ সময়ে শিক্ষার্থীদের দেশ ও জাতি গঠনে কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, সে বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে।
আমি আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে মনে করি, আমাদের এখনই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। সামার ভ্যাকেশন বা গ্রীষ্মের ছুটির সময়ে শিক্ষার্থীদের উৎপাদনশীল ও সমাজগঠনমূলক কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। সামার ভ্যাকেশনকে শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাধারণত ১ হাজার নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। স্বেচ্ছাশ্রমে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য এর থেকে কিছু নম্বর বরাদ্দ থাকতে পারে।
এমন অনেক দেশ আছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের শ্রমে বড় বড় স্থাপনা নির্মিত হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা শ্রমিকের বিকল্প হিসাবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। আমাদের দেশেও গ্রীষ্মের ছুটির সময় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় স্থাপনা নির্মাণকাজে নিয়োগ করা যেতে পারে। রাস্তাঘাট নির্মাণ, খাল খনন, জলাশয় পরিষ্কারকরণ, ব্রিজ সংস্কার, বৃক্ষরোপণ, কৃষিকাজ ইত্যাদি নানা ধরনের কাজে শিক্ষার্থীরা সাধারণ শ্রমিকদের পাশাপাশি কাজ করবে। মেয়ে শিক্ষার্থীরা সামাজিক কুসংস্কার সম্পর্কে গ্রামীণ নারীদের অবহিত করবে। নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, যৌতুক ইত্যাদি সমাজবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে গ্রামীণ নারীদের সচতেন করে তুলবে। যৌতুক প্রথা ও বাল্যবিবাহ সমাজের জন্য কতটা ক্ষতিকর সে সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারে। শিক্ষার্থীরা গ্রামীণ নারীদের সঙ্গে মিশলে তাদের সমস্যার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারবে। অল্প কষ্টসাধ্য কাজে ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও অংশগ্রহণ করতে পারে; যারা কখনোই শহরের বাইরে যায়নি, তারাও এ কাজের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। এ কাজের জন্য তাদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না। তবে কর্মস্থলে থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। সামান্য পকেট মানির ব্যবস্থা থাকতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা আর্থিকভাবে দুর্বল, তারা এ পকেট মানি দিয়ে তাদের পড়াশোনার খরচ কিছুটা মেটাতে পারবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিক্ষার্থী
- স্বেচ্ছাশ্রম