বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপুল মুনাফার আড়ালে কী
দেশের আর্থিক খাত নিয়ে চারদিকে যখন খারাপ খবর, তখন বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়ে চমক লাগানো তথ্য পাওয়া গেল। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি নিট মুনাফা করেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় মুনাফা বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। তাহলে এত মুনাফা কীভাবে হলো? এটি কি অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের প্রমাণ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা কত বেড়েছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট বা গ্রস মুনাফা হয়েছে ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যয় হয় ৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। ফলে নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ২৩ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে নিট মুনাফা ছিল ২২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা।
এই মুনাফা থেকে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ নিট মুনাফার প্রায় পুরোটাই সরকার পেয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছয়টি মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রণোদনা বোনাস হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এবার মুনাফা বাড়ল কেন
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করেছে। এক. দেশের কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং দৈনন্দিন লেনদেন চালু রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এসব ব্যাংককে রেপো, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ও বিশেষ তারল্য সহায়তার আওতায় বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বিপরীতে পাওয়া সুদ বাংলাদেশ ব্যাংকের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল।
এখানে বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় বাড়লেও এর একটি অংশ এসেছে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা থেকে। ব্যাংকগুলো শক্তিশালী ও সুশাসিত হলে এত বিপুল জরুরি তারল্য সহায়তার প্রয়োজন কিন্তু হতো না।
দুই. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। বছরের অধিকাংশ সময় নীতি সুদহার উঁচু থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থের ওপর ব্যাংকগুলোকে বেশি সুদ দিতে হয়েছে। ফলে ঋণ ও তারল্য সহায়তা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় বেড়েছে। সরকারকে দেওয়া ঋণ ও সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ থেকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদ পেয়েছে। রাজস্ব আদায় ও বৈদেশিক অর্থায়নে ঘাটতি থাকায় সরকারকে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে। একই সময়ে সরকারি সিকিউরিটিজের সুদহারও উঁচু ছিল। অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় অনুসরণ করা সুদহার নীতিও বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে।
তিন. বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি বড় অংশ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানত, বিদেশি সরকারি বন্ড এবং অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি নিরাপদ আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ করে। আন্তর্জাতিক সুদহার আগের কয়েক বছরের তুলনায় উঁচু থাকায় এসব বিনিয়োগ থেকেও ভালো আয় হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব কী
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এ কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির ছয়টি প্রধান কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন; বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন; মুদ্রা, রাজস্ব ও বিনিময় হার নীতির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং এসব নীতির অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া; বাংলাদেশের সরকারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারণ ও পরিচালনা; ব্যাংক নোট ইস্যুসহ নিরাপদ ও দক্ষ পরিশোধব্যবস্থা গড়ে তোলা ও নিয়ন্ত্রণ করা; এবং ব্যাংক কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ ও তদারক করা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মুনাফা অর্জন
- বাংলাদেশ ব্যাংক