ইসলামিক নেটো বলে পরিচিতি পাওয়া ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ মাত্র তিন দেশের একটি ছোট্ট ব্লক হলেও প্রচার পেয়েছে বিশাল। এই প্রচার পাওয়ার পেছনে মূল উপাদান হিসেবে কাজ করেছে নানা রকমের জল্পনাকল্পনা। অনেকেই এর মধ্যে এমন সব ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন, যা নাকি বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
তবে কেবল মক্কা চুক্তি একা এত জল্পনাকল্পনার জন্ম দিতে পারত না। আসল ঘটনা ঘটেছে এই চুক্তিতে নেটোর ‘৫ম দফা’র অন্তর্ভুক্তি। যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যে কোনো এক দেশের ওপরে আক্রমণ মানেই তা অন্য সবার ওপরে আক্রমণ বলে বিবেচিত হবে। তদুপরি, অন্তর্ভুক্ত তিনটি দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই দুইয়ের যোগফলে অনানুষ্ঠানিকভাবে এর গায়ে ‘ইসলামিক নেটো’ বলে তকমা লাগিয়ে দিয়েছে।
সমস্যা হলো, ‘ইসলামিক নেটো’ নামটি এর আকার ও শক্তি—উভয় দিক নিয়েই একটি অতিরঞ্জিত ধারণা তৈরি করে। প্রকৃতপক্ষে এই নামটির সঙ্গে আসল নেটো ও মুসলিম দেশগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি খুব সামান্য।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই তিন দেশের নিজেদের সম্পর্কের মধ্যেই নানারকম জটিলতা বিদ্যমান। আবার তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম দেশের নানারকম ঝামেলাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে অনেক অমুসলিম দেশ, যারা বিভিন্ন মুসলিম দেশের সঙ্গে শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি করে রেখেছে, তাদের সঙ্গে এই তিন দেশের কারও না কারও গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরব ও তুরস্ক উভয়েরই নানারূপ স্বার্থের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা যায়। আর পাকিস্তানসহ ওই তিন দেশই যুক্তরাষ্ট্র বলয়ের অন্তর্ভুক্ত।
এই তিন দেশের কেউই কোনোদিন মধ্যপ্রাচ্য বলে পরিচিত পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল নীতির কার্যকর বিরোধিতা করেনি। পাকিস্তান ছাড়া অপর দুটি দেশের সঙ্গেই ইসরায়েলের বন্ধুত্ব দিনদিন বাড়ছে। তুরস্ক তো নেটোরই সদস্য। যদি এই তিন দেশের কেউ মার্কিন-ইসরায়েল লবির কোনো দেশ দ্বারা আক্রান্ত হয়, বাকিরা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে গিয়ে তার জন্য যুদ্ধ করবে, এ কথা কি বিশ্বাসযোগ্য? আর যদি এমন হয় যে, পশ্চিম এশিয়ার কোনো মুসলিম দেশই এই তিন দেশের একটিকে আক্রমণ করে বসল, তখন কী ঘটবে? বাকিরা কি ওই আক্রমণকারী মুসলিম দেশটির সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে? তেমন আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণ কতটা ইসলামিক আর কতটা ভ্রাতৃঘাতী হবে?
মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিন থেকেই যে হুতিরা সৌদি আরবে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে এই ইসলামিক নেটোর তাকিয়ে দেখা ছাড়া করার কিছু নেই। ইরান যে সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হামলা করে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছে, তাতে কি এই ইসলামিক নেটো এখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে? যদি যায় তা কি এরপরও ইসলামিক বলে পরিচিতি পাবে, না তা সম্ভব? আর ইরানের বিরুদ্ধে কি এদের কারও যুদ্ধে যাওয়ার হিম্মত আছে? যখন বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্রেরই কিনা নাস্তানাবুদ অবস্থা! এখন তাই তারা ইরানকে আমন্ত্রণ করছে এই জোটে আসার জন্য। ইরান তো এদের কোনো একটি দেশের ন্যূনতম সহযোগিতা ছাড়াই বিশ্বের এক অপশক্তির জোটকে দাঁতভাঙা জবাব দিচ্ছে। এই সামরিক জোটের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তাদেরই ইরানের আশীর্বাদ প্রয়োজন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই সামরিক জোটকে স্বাগতম জানিয়ে সে দায় আংশিক পূরণ করেছেন বৈকি।