শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসু যে ওয়েবসাইট তৈরি করেছে, তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শিক্ষকদের বেশির ভাগ ডাকসুর এই উদ্যোগে ক্ষুব্ধ। তাঁরা মনে করছেন, উদ্যোগটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেওয়া উচিত ছিল, ডাকসুর নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ১০ সেপ্টেম্বর ওয়েবসাইটটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে। এরপর গতকাল রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৮৯ জন শিক্ষার্থী শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেছেন। কোন শিক্ষক কত নম্বর পেয়েছেন, তা ওয়েবসাইটটি থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেক শিক্ষক ব্যঙ্গ ও কটূক্তির (ট্রল) শিকার হচ্ছেন।
শিক্ষকেরা বলছেন, এখতিয়ারের বাইরে শিক্ষকদের মূল্যায়নের উদ্যোগ অগ্রহণযোগ্য। তার চেয়েও অগ্রহণযোগ্য প্রাপ্ত নম্বর গোপন রাখতে না পারা। পড়াতে না পারলে শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। তবে হেয় করার সুযোগ নেই।
ডাকসু যেভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করেছে, তার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এদিকে সমালোচনার মুখে গতকাল মূল্যায়নে শিক্ষকদের প্রাপ্ত নম্বর দেখার সুযোগ বন্ধ করে দেয় ডাকসু। কিন্তু এর আগেই নম্বর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্কতার সঙ্গে করা দরকার। এর মধ্যে কিছু বিষয় গোপনীয় রাখতেই হবে, নইলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, শিক্ষকদের কাজ শুধু ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা গবেষণা ও অন্যান্য কাজের সঙ্গেও যুক্ত থাকেন। এ ধরনের জরিপ তাই শিক্ষক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেয় না।
মূল্যায়ন কেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০ সালে বিভাগের সংখ্যা ছিল ৪৭। এখন ৮৪টি। দুই দশকে ৯টি থেকে বেড়ে ইনস্টিটিউট হয়েছে ১২টি। সাড়ে ২২ হাজার থেকে নিয়মিত শিক্ষার্থী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজারের বেশি। শিক্ষকসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজারে (২ হাজার ১৫ জন)।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষক রাজনীতিতে দল ভারী করতে একের পর এক বিভাগ খোলা ও শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের অনেকের বিরুদ্ধে নিজেরা পড়াশোনা না করা, গবেষণায় ফাঁকি দেওয়া এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপছন্দের শিক্ষার্থীদের নম্বর কম দেওয়া, পছন্দের শিক্ষার্থীকে বেশি দেওয়া এবং হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ কম। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের মূল্যায়নের দাবিও ছিল।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ছিল। মেয়াদ শেষের চার দিন আগে শিক্ষক মূল্যায়নের একটি ওয়েবসাইট চালু করে ডাকসু। নাম ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’।
ওয়েবসাইটটি চালুর ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া। তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। ওয়েবসাইট চালুর অনুষ্ঠানে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমসহ শিবির-সমর্থিত প্যানেলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন না ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটটি চালুর জন্য তিনি বিগত এক বছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে গিয়েছেন; কিন্তু পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আপত্তি থাকলেও ওয়েবসাইটটি চলবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।