কোনো সুখবর নেই। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট দেশের সব পেশার মানুষকে ভোগাচ্ছে। দিনের বেশির ভাগ সময়ই বাসাবাড়িতে গ্যাস থাকে না। আর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরছে না ফ্যান। শিল্পকারখানায় মেশিনের চাকা বন্ধ। সাধারণ মানুষের ওপর এর বহুমুখী প্রভাব পড়ছে। মানুষের আয় কমছে। এতে ক্ষুব্ধ সব শ্রেণির মানুষ। বিরোধী দলও সংসদের বাইরে রাজপথের আন্দোলনে নেমেছে। এ নিয়ে সব মহলের সমালোচনায় সরকার বিব্রত। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে প্রকাশ্যে এ বিষয়ে অস্বস্তির কথা স্বীকার করছে। তবে দাবি, এই সংকট তাদের সৃষ্টি নয়। তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। সংকট সমাধানের সহজ কোনো পথ নেই।
Advertisement
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য কিংবা আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তবে এটি সব সরকারের আমলেই কম-বেশি ছিল। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবার যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা দেশের জন্য বড় দুর্যোগ। অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। তিনি বলেন, এই দুর্যোগ মোকাবিলার সহজ কোনো পথ নেই। এজন্য সময় লাগবে। সবাইকে এটা মেনে নিতে হবে। শুধু সরকারকে দায়ী করে লাভ নেই। একক কোনো সরকার সম্পূর্ণভাবে দায়ী নয়। যে কোনো সরকার থাকলে একই অবস্থা হতো। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ কম। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে। আবার ভারতের আদানি গ্রুপের কাছ থেকে কেনা বিদ্যুৎ চুক্তি অনুসারে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা অর্ধেক বিদ্যুৎ দিচ্ছে। সবকিছু মিলে বড় সংকট তৈরি হয়েছে।
আবু আহমেদ বলেন, সরকার চেষ্টা করছে। কয়েকটি কুইক রেন্টাল পাওয়ার সচল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসবের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এজন্য এক বছরের বেশি সময় লাগবে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দেশের সব মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে বস্তির ঝুপড়ি ঘর পর্যন্ত সবাই ভুক্তভোগী। গ্রাম থেকে শহর-কেউ এর বাইরে নেই। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, এই মৌসুমে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন হয় ১৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। ফলে কাগজে-কলমে ঘাটতি ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গ্রামে কোথাও কোথাও দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টিই জ্বালানি সংকটে ভুগছে। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তেলভিত্তিক ও দুটি কয়লাভিত্তিক। গ্যাসের চাপও কমে গেছে। অন্যদিকে বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। বিপরীতে মিলছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ প্রতিদিন ঘাটতি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক সরবরাহ কমে ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডিতে নেমেছে। আর এলএনজি আমদানি করে যোগ করা হচ্ছে ১ হাজার এমএমসিএফডির মতো। বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গ্যাস সরবরাহ কমছে। ঘাটতি পূরণে সরকারকে এখন দামি তেল ও ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হচ্ছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। সাধারণত লোকসানের কারণে অনেক সময় যা বন্ধ রাখা হয়।