ডেঙ্গুর দাপট : প্রয়োজন জেলাভিত্তিক প্রস্তুতি
একসময় বাংলাদেশে ডেঙ্গুকে মূলত ঢাকার রোগ হিসেবে দেখা হতো। এখন সেই ধারণা দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ডেঙ্গু রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে জেলা শহর, উপজেলা, এমনকি গ্রাম ও পাহাড়ি এলাকায়ও বিস্তৃত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়া প্রমাণ করছে, এটি আর শুধু নগরকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং সারা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি। চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৫ হাজার ৪৭৫ এবং মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের। এর মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৫৭১ জন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংখ্যা শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে রিপোর্ট হওয়া হাসপাতালভিত্তিক রোগীর হিসাব। সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে থাকা বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া অনেক রোগী এই হিসাবের আওতায় আসে না। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের ডেঙ্গু পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হওয়ার দাবি রাখে।
ডেঙ্গু ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক আন্ত সম্পর্কিত কারণ কাজ করছে। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দ্রুত ও অপরিকল্পিতভাবে জেলা ও উপজেলা শহরের সম্প্রসারণ, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা, নির্মাণাধীন ভবন ও অবকাঠামোর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এডিস মশার প্রজননের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করছে। জেলা ও উপজেলা শহরে নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠলেও অনেক স্থানে সড়ক, ড্রেনেজ ও পানি ব্যবস্থাপনা সেই হারে উন্নত হয়নি। নির্মাণাধীন ভবনে পড়ে থাকা বিভিন্ন পাত্র, ড্রাম, ট্যাংক, ছাদ, পরিত্যক্ত সামগ্রী ও গর্তে বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে শহরের বাইরে মানুষের বসতবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও অন্যান্য স্থাপনায় জমে থাকা পানিও এডিস মশা বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। জলবায়ু ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনও অনেক এলাকায় মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের ব্যাপক ও দ্রুত চলাচল। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, ব্যবসা, চিকিৎসা কিংবা পারিবারিক কারণে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের সঙ্গে জেলা, উপজেলা ও গ্রামের মধ্যে যাতায়াত করে। একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তি যখন রোগের সংক্রমণযোগ্য পর্যায়ে নিজের জেলা, উপজেলা বা গ্রামের বাড়িতে যান, তখন সেখানে উপস্থিত এডিস মশার মাধ্যমে নতুন সংক্রমণ শুরু হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মশাটি আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ে ভাইরাস গ্রহণ করার পর অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ালে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের নতুন চক্র তৈরি হতে পারে। ফলে একটি শহরে শুরু হওয়া সংক্রমণ মানুষের চলাচলের মাধ্যমে অন্য এলাকায় পৌঁছে সেখানে স্থানীয় এডিস মশার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব জেলা বা গ্রামে এডিস মশার ঘনত্ব এরই মধ্যে বেড়েছে, সেসব এলাকায় আক্রান্ত ব্যক্তির আগমন নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ কারণে ডেঙ্গুর বিস্তারকে শুধু মশার বিস্তার হিসেবে দেখলে হবে না, এটিকে মানুষের চলাচল, ভাইরাসের উপস্থিতি এবং স্থানীয় এডিস মশার পারস্পরিক সংযোগের ফল হিসেবে দেখতে হবে। কোনো এলাকায় এডিস মশা থাকলেই সেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণ হবে না, কিন্তু সেখানে যদি ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন এবং এডিস মশা তাঁকে কামড়ানোর সুযোগ পায়, তাহলে সংক্রমণের স্থানীয় চক্র শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশা নিধন নয়, আক্রান্ত রোগীর ব্যবস্থাপনা, রোগীর মশার কামড় থেকে সুরক্ষা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং স্থানীয় এডিস মশার ঘনত্ব ও প্রজননস্থলের নিয়মিত নজরদারি—সব বিষয়কে একই কৌশলের আওতায় আনতে হবে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ বোঝার জন্য এই চক্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে ভাইরাস থাকা অবস্থায় তাঁকে এডিস মশা কামড়ালে মশাটি ভাইরাস বহন করতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেই মশা অন্য মানুষকে কামড়ালে নতুন সংক্রমণ ঘটতে পারে। অর্থাৎ রোগী ও বাহক—এই দুটির সংযোগই সংক্রমণ বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসার পাশাপাশি মশার কামড় থেকে সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে অসুস্থ অবস্থায় মশারির ব্যবহার এবং বাড়িতে মশার সংস্পর্শ কমানো জরুরি।
ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার যে এখন বাস্তবতা, খুলনা বিভাগের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আগস্ট মাসে খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ হয়েছিল এবং মৃত্যুও বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে বিভাগটিতে এক দিনে ২৪৭ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরও এসেছে; বছরের শুরু থেকে সেখানে ছয় হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত এবং ১৯ জনের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়েছে।
খুলনা, বাগেরহাটসহ এ অঞ্চলের পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা সেখানে বিদ্যমান এবং মানুষের মধ্যে রোগ সংক্রমণের পরিবেশও তৈরি হয়েছে। হাসপাতালগুলোতেও এর প্রভাব পড়ছে। খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শয্যাসংকট তৈরি হওয়ার খবর এসেছে। অর্থাৎ ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু শুধু রোগীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।