স্ক্রিনের বন্দিদশা থেকে বিদ্যালয়গুলোতে মুক্তির ডাক
আজ ২০২৬ সালের এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রযুক্তির অন্ধ অনুকরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী আন্দোলন শুরু হয়েছে। ২০২০-২১ সালের কোভিড-১৯ মহামারির সেই অবরুদ্ধ দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির এক অভূতপূর্ব প্রবেশ ঘটেছিল। তখন মনে করা হয়েছিল ডিজিটাল ডিভাইস ছাড়া বুঝি ভবিষ্যৎ শিক্ষা চলবেই না। কিন্তু গত কয়েক বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতায় এখন সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে গেছে। বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছেন যে স্কুলে অতিরিক্ত স্ক্রিন বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার শিক্ষার্থীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই বৈশ্বিক সচেতনতার ঢেউ এখন বাংলাদেশেও এসে লেগেছে এবং আমাদের দেশের অভিভাবকেরাও এ ব্যাপারে নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে রাজধানীসহ দেশের শহরকেন্দ্রিক যেসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনায় ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছিল, সেখানকার শিক্ষক ও অভিভাবকেরা এখন পুনরায় বই-খাতানির্ভর বাস্তবমুখী শিক্ষায় ফেরার তাগিদ দিচ্ছেন। বাংলাদেশের স্কুলগুলোতেও শিক্ষার্থীদের স্ক্রিন টাইম কমিয়ে আনতে এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন চালুর জন্য জোর দাবি জানাচ্ছেন।
প্রথম দিকে প্রযুক্তি-নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং অনেক শিক্ষাবিদও ধারণা করেছিলেন যে প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার্থীদের শেখার গতি অভাবনীয়ভাবে ত্বরান্বিত করবে এবং শিক্ষাকে আরও ইন্টারেক্টিভ ও আনন্দদায়ক করে তুলবে। গ্যামিফিকেশন, অ্যানিমেশন আর ডিজিটাল কনটেন্টের চমকে আমরা ভেবেছিলাম শিক্ষার মান হয়তো বহুগুণ বেড়ে যাবে। কিন্তু ২০২৬ সালের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে সেই ‘ডিজিটাল ইউটোপিয়া’ বা কল্পরাজ্যের মোহভঙ্গ ঘটে। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এখন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিক্ষার্থীদের গভীর মনোযোগ এবং বিশ্লেষণাত্মক চিন্তার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করেছে। একটি ছাপার অক্ষরের বইয়ের পাতা উল্টে পড়ার মধ্যে যে জ্ঞানগত সুবিধা, স্পর্শজনিত স্মৃতি এবং মস্তিষ্কের নিউরাল সংযোগ তৈরির ক্ষমতা রয়েছে, তা ডিজিটাল স্ক্রিনে দ্রুত স্ক্রল করার মাধ্যমে কখনোই পাওয়া যায় না। স্ক্রিনে পড়ার সময় শিক্ষার্থীরা গভীরে যাওয়ার বদলে কেবল ওপরে-ওপরে চোখ বুলিয়ে যায়, যার ফলে পঠিত বিষয়ের দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বর্তমানে ডিভাইসগুলো শিক্ষার উপকরণের চেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মনোযোগ বিঘ্নকারী সবচেয়ে বড় বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ডিজিটাল ডিভাইসের এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে, তা ২০২৬ সালে এসে এক বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকার ফলে শিশুদের মধ্যে ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেইন’ বা চোখের শুষ্কতা ও দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হওয়ার সমস্যা মহামারির আকার ধারণ করেছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টির হার আগের যেকোনো দশকের চেয়ে এখন সর্বোচ্চ। পাশাপাশি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিভাইসের ওপর ঝুঁকে থাকার কারণে ঘাড় ও পিঠের ব্যথা বা ‘টেক নেক’-এর মতো শারীরিক উপসর্গ এখন স্কুলপড়ুয়াদের নিত্যসঙ্গী। এ ছাড়া ডিভাইসের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দিয়ে শিশুদের স্বাভাবিক ঘুমের চক্রকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে, যা তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শারীরিক ক্ষতির চেয়েও ২০২৬ সালে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবক্ষয়। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং এর সঙ্গে যুক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে শিশুদের মধ্যে একাকিত্ব, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং মনোযোগহীনতার ব্যাধি (এডিএইচডি-এর লক্ষণ) আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রেণিকক্ষে যখন প্রতিটি শিশু নিজের ট্যাবলেটের স্ক্রিনে মগ্ন থাকে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, সহমর্মিতা এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করার মানবিক গুণাবলিগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না। বাস্তব জগতের মানুষের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হয়, কীভাবে অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হয়—ডিজিটাল ডিভাইসের ঘেরাটোপে পড়ে আজকের অনেক শিশুই সেই সাধারণ সামাজিক দক্ষতাগুলো হারিয়ে ফেলছে। ডোপামিন-চালিত এই স্ক্রিন আসক্তি শিশুদের ধৈর্যহীন করে তুলছে।
শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি ২০২৬ সালে এসে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি। শারীরিক কষ্টগুলো বাইরে থেকে দেখা যায়, কিন্তু মনের ভেতরের ক্ষতের খবর অনেকেই সহজে বুঝতে পারছেন না। অতিরিক্ত সময় স্ক্রিনে কাটানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেশায় পড়ে শিশুরা বাস্তব জগৎ থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ভার্চুয়াল জগতে সারাক্ষণ অন্যের সাজানো জীবন দেখে তাদের নিজেদের মনে একধরনের একাকিত্ব, বিষণ্ণতা ও অহেতুক দুশ্চিন্তা কাজ করছে। স্ক্রিনে ছবি বা ভিডিও এত দ্রুত বদলায় যে বাস্তব জীবনে কোনো একটি স্থির বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলছে। এমনকি অনেক শিশুর মধ্যে অতি-চাঞ্চল্য বা মনোযোগহীনতার মতো জটিল মানসিক ব্যাধিও এখন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিক্ষার্থী
- স্ক্রিন টাইম