শুধু খাদ্যনিরাপত্তাই নয়, চাই পুষ্টিনিরাপত্তাও
বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের বাজার নিয়ে আবার নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর সবশেষ তথ্যমতে, গত আগস্টে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এফএওর সার্বিক খাদ্য মূল্যসূচক আগস্টে এক লাফে গড়ে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা আগের মাসের চেয়ে বেশি। যদিও ২০২২ সালের মার্চে ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকের সর্বকালের রেকর্ড দামের চেয়ে এটি এখনো কিছুটা নিচে আছে। তবু তিন বছরের মধ্যে শস্যের দাম এবং এক বছরের মধ্যে চিনির দাম এভাবে বেড়ে যাওয়া স্পষ্টতই এক বড় বিপৎসংকেত দিচ্ছে। এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো পরিষ্কার সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দামের এই হঠাৎ উল্লম্ফন আসলে ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝড়ের পূর্বাভাস।
বিশ্বের এমন পরিস্থিতির পেছনে কারণগুলো খুব জটিল না হলেও সমাধানটা বেশ কঠিন। ইউরোপজুড়ে তীব্র দাবদাহ আর ভয়াবহ খরা কৃষিকে বিপর্যস্ত করেছে। সেখানে ভুট্টা ও সুগার বিটের উৎপাদন ভীষণভাবে কমে গেছে। ফলে গবাদিপশুর খাবারের অভাব তৈরি হচ্ছে। আবহাওয়ার ভয়াল এল নিনোর প্রভাব এশিয়ার কৃষিতেও বড় আঘাত হানার শঙ্কা জাগিয়েছে, যার সরাসরি ধাক্কা লাগছে খাদ্য উৎপাদনে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভূরাজনীতি। সাড়ে চার বছর ধরে চলা রাশিয়া ও ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বাড়ছে। ফলে বিশ্ববাজারে শস্যের জোগান বিঘ্নিত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সারের সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করছে। খাদ্যপণ্যের ভেতর শুধু চিনির দামই গত আগস্টে প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে, আর উদ্ভিজ্জ তেল ও প্রধান শস্যগুলোর দামও ঊর্ধ্বমুখী। এফএও তাদের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি বছরে বৈশ্বিক শস্য উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কমতে পারে, যা গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। এমন এক অস্থির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের মতো আমদানিনির্ভর এবং বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশকে নিজের ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তার হিসাব নতুন করে কষতেই হবে।
এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন নিজেদের দেশের দিকে তাকাই, তখন প্রথম যে ধাক্কাটা আসে তা হলো তথ্যের বিভ্রান্তি। যেকোনো দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যের পরিকল্পনা নির্ভর করে সঠিক পরিসংখ্যানের ওপর। অথচ আমাদের দেশে তথ্যের সংকট এতটাই প্রকট যে নীতিনির্ধারকেরা কোন তথ্যের ওপর ভরসা করবেন, তা বোঝা দায় হয়ে পড়ে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আপনাদের কাছে পরিষ্কার হবে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছিল, দেশে ধান উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ টন, অথচ একই সময়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দাবি করেছে, উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টনের বেশি। ভাবুন তো, এক বছরে শুধু ধান উৎপাদনেই দুই সরকারি সংস্থার হিসাবের ব্যবধান প্রায় ২৩ থেকে ২৪ লাখ টন। আবার ২০২১-২২ অর্থবছরে ফলের উৎপাদনের ক্ষেত্রেও একই তামাশা দেখা গেল। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবমতে, ফল উৎপাদন ছিল ৬০ লাখ মেট্রিক টন, আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানাল, উৎপাদন ১ কোটি ২৫ লাখ টন। দ্বিগুণের বেশি এই গরমিল থাকলে দেশ কীভাবে খাদ্যের সংকট মোকাবিলা করবে? চালের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন নিয়ে যদি এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তাহলে ঘাটতি ও আমদানির সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই আগামীর কৃষি ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে এই সমন্বয়হীনতা ও তথ্যের অস্বচ্ছতা দূর করে বাস্তবসম্মত পরিসংখ্যান গ্রহণ করা জরুরি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- খাদ্য নিরাপত্তা