রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র কী হওয়া উচিত-কল্যাণমূলক, নাকি বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষাকারী? এ প্রশ্ন যখনই সামনে আসে, তখন অর্থনীতির গাণিতিক হিসাবের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। সম্প্রতি ঘোষিত নবম পে-স্কেল যেন ঠিক সেদিকেই আঙুল তুলেছে। জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বাসাভাড়া বেড়েছে। সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত-সবকিছুর খরচ বেড়েছে। ফলে তাদের বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাকি জনগোষ্ঠীর সমস্যা কে দেখবে?
সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের জন্য বেতন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। কিন্তু সামগ্রিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এর পেছনের সমীকরণগুলো যখন মেলাতে যাই, তখন এক গভীর অস্বস্তি জেঁকে বসে। এ কোন অর্থনীতি, যেখানে দেশের ১৮ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ২৪ লাখ (১.৩৩ শতাংশের মতো) রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর সুফল ভোগ করে, অথচ তাদের এই বেতন বৃদ্ধির ঘানি টানতে হয় বাকি প্রায় নিরানব্বই শতাংশ সাধারণ মানুষকে? পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচ বুঝতে খুব বেশি অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। রাষ্ট্র যখন তার বাজেটের একটি বিশাল অংশ সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পেছনে বরাদ্দ করে, তখন সেই অর্থের উৎস খুঁজতে আমাদের পকেটই হাতড়াতে হয়। এই বাড়তি টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। আসে জনগণের দেওয়া পরোক্ষ কর, ভ্যাট এবং সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো আয়ের অংশবিশেষ থেকে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে বাড়তি টাকা আসা মানেই বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যাওয়া, যার অনিবার্য পরিণতি সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়া। অথচ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, যারা দ্রব্যমূল্যের এই লাগামহীন গতিতে পিষ্ট হয়, তাদের আয় বাড়ে না।