দেশের মানুষের মধ্যে যে পারস্পরিক বিদ্বেষভাব প্রকাশ পাচ্ছে, এর মূল কারণ দারিদ্র্য। মানুষ যখন দরিদ্র থাকে, তখন তাদের ভাগ করতে সুবিধা হয়। দরিদ্র মানুষকে যেভাবে ধর্মীয় নেতারা ভাগ করতে পারে, তেমনই রাজনৈতিক নেতারাও ভাগ করতে পারে। আর এভাবে সমাজে বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং একে অপরের বিষোদ্গার করে। মানুষের ভেতরে যে শক্তি, সেটা তখন তারা তাদের দৃষ্টিতে যাদের বিপক্ষ শক্তি মনে হয়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে থাকে। ফলে সমাজে সৃষ্টি হয় হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা। আর এ থেকেই সমাজে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা, যা দেশ ও জাতির জন্য ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনে। এর পরিণতি কখনো কখনো দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি হিসাবেও দেখা দিতে পারে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক দীনতা বেকারত্বের অভিশাপকে দীর্ঘ করে। যত বেকারত্ব বাড়বে, ততই সমাজ বিভক্ত হতে থাকবে। বেকার লোকদের যেহেতু কোনো কাজ থাকে না, তাই তাদের মস্তিষ্কে নানা ধরনের কুমন্ত্রণা প্রভাব বিস্তার করে। ফলে তারা তাদের পাশের লোকগুলোকেও ক্ষতিকর মনে করে। যেহেতু বেকারদের সৃষ্টিশীল কোনো কাজ করার উপায় থাকে না, এবং তারা সমাজের আট-দশজন সচ্ছল মানুষের চেয়ে নিচে পড়ে থাকে, সেহেতু তারা অন্যকে শত্রু মনে করে এবং তার বিপক্ষে কাজ করা শুরু করে দেয়। এ কারণে সমাজে বিভক্তি শুরু হয় এবং অস্থিরতা দানা বাঁধতে থাকে। বাংলাদেশও এ দর্শনের বাইরে নয়। দেশ স্বাধীন হয়েছে অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল পার হয়ে গেছে। কিন্তু যে গতিতে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হওয়া উচিত ছিল, সে গতিতে উন্নয়ন হয়নি। স্বাধীনতার পর প্রথম ১০ বছর এক ধরনের কাল্পনিক সমাজতন্ত্র কায়েম করার চেষ্টা করা হয়েছিল। শুরুতেই পাকিস্তান আমলে গড়া দেশের সব শিল্পকারখানাগুলো জাতীয়করণ করা হয়। বাঙালিদেরও যেসব কলকারখানা ছিল যেমন-পাটকল, বস্ত্রক-সেগুলোও জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণ করে কল্পিত সমাজতন্ত্র ধারার অর্থনীতি যে সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না, সে কথা বলার জন্য তেমন কোনো লোকও ছিল না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা তখন একধরনের একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। বিকল্প চিন্তাধারাকে আমলে নেওয়া হয়নি। কল্পিত সমাজতন্ত্রের গতিধারার ফলে দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। বেকার সমস্যা বাড়তে থাকে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- দারিদ্র্যতা