বিজনেসে এআই: ব্যর্থতার হার কেন বেশি?
ব্যক্তিগত পর্যায়ে এআই ব্যবহার করা সহজ, কিন্তু এআইকে ব্যবসায় নামানো অত সহজ নয়। গত দুই বছরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। এই দুটি বিষয়ের ফারাক না বোঝার কারণেই বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে প্রচুর টাকা নষ্ট হচ্ছে। অনেকে ভাবেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট তো সহজেই চালানো যায়, কাজেই প্রতিষ্ঠানে এআই যুক্ত করাও হয়তো ততটাই সহজ। মূলত এই ভুল ধারণা থেকেই বিপদের শুরু হয়।
চলুন কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা করি। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বড় বড় কোম্পানিগুলো এআই খাতে প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু, এর মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি বিনিয়োগ থেকে কোনো বাস্তব ফলাফল আসেনি। এটি কেবল ছোট কোনো প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়, বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবচিত্র।
এর পেছনে মূল কারণটি কী? এমআইটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৫ শতাংশ কোম্পানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালু করেও কোনো পরিমাপযোগ্য সুফল পায়নি। তবে এই ব্যর্থতার পেছনে এআই মডেলের কোনো দোষ নেই। মূল সমস্যা হলো ডেটার সঠিক প্রস্তুতির অভাব, কাজের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলাফলের সংযোগ না থাকা এবং কাজ শুরুর আগেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ না করা।
বিষয়টি আরেকটু সহজ করে বলি। একটা সাধারণ মডেল চালানো আর একটা পুরোনো ব্যবসায়িক ব্যবস্থার ভেতরে ওই মডেলকে সফলভাবে বসানো সম্পূর্ণ আলাদা দুটি কাজ। একটি ব্যবসার প্রক্রিয়ার কোথায় ডেটা আসে, কোথায় অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে এবং কোথায় পুরোনো ব্যবস্থা এই রূপান্তরকে আটকে দেবে, সেসব বোঝার জন্য ওই ব্যবসার গভীর প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা দরকার। যাকে সহজ ভাষায় ‘ডোমেইন নলেজ’ বলে থাকি। একই সঙ্গে ওই ব্যবসাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাইপলাইনে যুক্ত করার জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রযুক্তিগত জ্ঞান। দুটো একসঙ্গে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ব্যর্থ হওয়া প্রকল্পগুলোর প্রায় ৫৬ শতাংশের ক্ষেত্রে কোম্পানির শীর্ষ নেতৃত্ব প্রথম নমুনা দেখার পরেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তাদের অনেকেই এআইকে কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্রকল্প হিসেবে দেখেন, কিন্তু আসল ব্যবসায়িক রূপান্তর হিসেবে বিবেচনা করেন না। এর ফলে প্রজেক্টের চূড়ান্ত ফলাফলের দায়ভার কেউ নিতে চান না।
ঠিক এই জায়গাটিতেই চলে আসে ফরওয়ার্ড ডেপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ারিং বা এফডিইর ধারণা। এই ধারণার মূল বিষয় বেশ সহজ। একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সরাসরি ক্রেতার অফিসে গিয়ে তাদের দলের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করবেন। তিনি তাদের ব্যবসার ধরন ও ডেটা বুঝবেন, তারপর ওই অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমাধান বাস্তবায়ন করবেন। এটি কেবল কোনো সফটওয়্যার সার্ভিস পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং ব্যবসার প্রকৃত ফলাফল নিশ্চিত করার একটি উপায়। গত ১৫ বছরে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে বড় শিক্ষা, যাকে ইংরেজিতে আমরা বিজনেস আউটকাম বলি।
সহজ ভাষায় বললে, এই মডেলটি নির্দিষ্ট কিছু জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করে। যখন কোনো কোম্পানি এমন কোনো জটিল প্রযুক্তি পণ্য বিক্রি করে যা ক্রেতার পক্ষে নিজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, তখন এই পদ্ধতির প্রয়োজন হয়। আমার অভিজ্ঞতা বলে, কাস্টমার তার ব্যবসা বোঝেন কিন্তু প্রযুক্তি বোঝেন না। ওই শূন্যস্থান পূরণ করাই এই বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীর কাজ।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি বড় ফাঁদও রয়েছে। অনেক কোম্পানি ভুল করে প্রতিটি ক্রেতার জন্য আলাদা আলাদা করে পুরো সিস্টেম তৈরি করে ফেলে। শুরুতে এটি দেখতে আকর্ষণীয় লাগলেও কিছুদিন পর বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। দশটি আলাদা ক্রেতার জন্য দশটি ভিন্ন সিস্টেম একসঙ্গে টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের পরামর্শনির্ভর ফাঁদে পড়ে অনেক কোম্পানি তাদের কাজের গতি হারিয়ে ফেলে। কারণ বাইরের পরামর্শদাতারা কাজ শেষ করে চলে গেলে তাদের ভেতরের দক্ষতাটুকুও সাথে নিয়ে যান। ওই কারণেই যে কোনো কোম্পানির জন্য নলেজ ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যে কোনো সফল প্রকল্প মূলত একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঠামোর ওপর গড়ে ওঠে। একটি মজবুত ভিত্তি থাকে, যেখানে মূল কিছু টুল আগে থেকেই তৈরি করা থাকে। ওই টুলগুলো ব্যবহার করেই প্রকৌশলী প্রতিটি ক্রেতার জন্য নতুন সমাধান তৈরি করেন। সবকিছু একদম শূন্য থেকে না বানিয়ে বরং ধাপে ধাপে জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়। এই দুইয়ের পার্থক্য অনেক বড় এবং বিষয়টি বোঝা খুব জরুরি।
২০২৬ সালে এসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও বেশি স্বায়ত্তশাসিত হয়ে উঠছে। অর্থাৎ সফটওয়্যার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মডুলার এবং স্বনির্ধারণযোগ্য। এতে কিন্তু ক্রেতার জটিলতা কমেনি, বরং বেড়ে গেছে। কারণ এখন শুধু সফটওয়্যার বুঝলেই চলে না, কর্তৃত্বশীল এআই কোথায় কীভাবে কাজ করবে সেটি বোঝাও জরুরি। সাধারণ চ্যাটবট থেকে স্বায়ত্তশাসিত কর্মপ্রবাহতে স্থানান্তরিত হতে গিয়েই ব্যর্থতার হার ৭০ শতাংশ থেকে এক লাফে ৮৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে। কারণ মূল কর্মপ্রবাহতে এআইকে সঠিকভাবে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।