এখন রাজনৈতিক দলগুলোর বদলে যাওয়ার সময়

যুগান্তর এ কে এম আহসান উল্লাহ প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০০

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অভ্যাস প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে-ক্ষমতায় থাকলে সব অর্জনের কৃতিত্ব নিজের, আর বিরোধী দলে থাকলে দেশের প্রায় সব ব্যর্থতার দায় সরকারের। রাজনৈতিক বক্তব্যের বড় অংশ তাই নীতির চেয়ে অভিযোগে, সমাধানের চেয়ে দোষারোপে, ভবিষ্যতের চেয়ে অতীতের হিসাব-নিকাশে ব্যয় হয়। অথচ একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি শুধু সরকারের বেশি বেশি ভুল ধরা নয়; বরং দেশের সামনে বেশি বেশি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হাজির করতে পারা।


বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই নিজেদের আধুনিক করতে চায়, তাহলে প্রথম পরিবর্তনটি প্রয়োজন রাজনীতির এ ধারণাতেই। বিরোধী দলের কাজ প্রশ্ন করা নিশ্চয়ই। সরকারের জবাবদিহি দাবি করাও গণতন্ত্রের মৌলিক অংশ। কিন্তু প্রশ্ন করাই রাজনীতির শেষ কাজ নয়। প্রশ্নের পরের বাক্যটি হওয়া উচিত : ‘আমরা হলে কী করতাম?’ দ্রব্যমূল্য বেড়েছে-কেন বেড়েছে তা বলার পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা কী হবে? তরুণদের কর্মসংস্থান হচ্ছে না, শুধু ব্যর্থতার পরিসংখ্যান দেখিয়ে নয়, কোন পাঁচটি খাতে আগামী পাঁচ বছরে কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব, তার পরিকল্পনা দিতে হবে। ব্যাংক খাত দুর্বল-কার দায়, সেই বিতর্কের পাশাপাশি সংস্কারের নকশাটিও জনগণকে দেখাতে হবে। পরিণত গণতন্ত্রে বিরোধী রাজনীতি অনেকাংশে এভাবেই কাজ করে। যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ছায়া মন্ত্রিসভার ঐতিহ্য রয়েছে। এর অর্থ হলো, বিরোধী দল শুধু ক্ষমতাসীন মন্ত্রীর সমালোচনা করে না; সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জন্য নিজেদের একজন দায়িত্বশীল মুখ রাখে, যিনি সেই খাত নিয়ে পড়াশোনা করেন, বিকল্প নীতি দেন এবং জনসমক্ষে তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। বাংলাদেশের দলগুলোও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, কৃষি, প্রযুক্তি, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার-প্রতিটি খাতে নীতিভিত্তিক বিশেষজ্ঞ দল রাখতে পারে। দল ক্ষমতায় না থাকলেও দেশের জন্য চিন্তা করা বন্ধ থাকবে কেন?


আরেকটি পরিবর্তন দরকার রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের ভাষায়। দেশে লাখো মানুষের সমাবেশকে প্রায়ই রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসাবে দেখানো হয়। অথচ ডিজিটাল যুগের ভোটার, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, ক্রমেই ভিন্ন প্রশ্ন করছে : আপনার ধারণা কী? আপনার পরিকল্পনা কী? আপনি সমস্যাটি বোঝেন কতটা? একটি বিশাল জনসভা একটি দিনের ছবি তৈরি করতে পারে, একটি ভালো নীতি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। তাই ‘শোডাউন’ থেকে রাজনীতিকে ‘আইডিয়া-ডাউনের’ দিকে নিতে হবে-কার কাছে ভালো ধারণা আছে, কার কাছে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা আছে, সেই প্রতিযোগিতা তৈরি করা প্রয়োজন।


জার্মানি, নর্ডিক দেশগুলো কিংবা নিউজিল্যান্ডের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে একটি বিষয় শেখার মতো-রাজনৈতিক মতভেদ সেখানে তীব্র হতে পারে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রের শত্রু বানিয়ে ফেলা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রীতি নয়। জাতীয় স্বার্থের বহু বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দল একসঙ্গে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একটি নতুন রাজনৈতিক নীতিবাক্য প্রতিষ্ঠা করা দরকার : আমার প্রতিপক্ষ আমার শত্রু নয়; সে-ও এ দেশের একজন অংশীদার। এটি শুধু ভদ্রতার প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। আজ আপনি বিরোধী দলে, কাল ক্ষমতায়; আজ যাকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে চাইছেন, কাল তার সমর্থকদের নিয়েই আপনাকে দেশ চালাতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চক্র শেষ পর্যন্ত কোনো দলকে স্থায়ী বিজয় দেয় না; রাষ্ট্রকে দুর্বল করে।


এ কারণেই রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ‘শিক্ষিত’ হওয়া এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে জরুরি। শিক্ষিত বলতে শুধু ডিগ্রিধারী বোঝাচ্ছি না। একজন রাজনীতিককে বাংলাদেশের সংবিধান, অর্থনীতি, ইতিহাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি, জলবায়ু, জনসংখ্যা, স্থানীয় প্রশাসন-অন্তত মৌলিক স্তরে বুঝতে হবে। একই সঙ্গে তাকে হতে হবে সভ্য ও সংযত। একজন প্রতিপক্ষকে অপমান করতে পারা রাজনৈতিক দক্ষতা নয়। মঞ্চে দাঁড়িয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা হুমকি দিয়ে জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা রাজনীতির মান বাড়ায় না; বরং সমাজকেও একই ভাষা শেখায়। আর পেশিশক্তির রাজনীতি সরাসরি পরিত্যাগ করা দরকার। দলের শক্তি বোঝাতে মোটরসাইকেল বহর, অস্ত্রের ইঙ্গিত, প্রতিপক্ষের সভা ভাঙা, ক্যাম্পাস দখল, বাজার নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভয় দেখানো-এগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতার নয়; বরং রাজনৈতিক দুর্বলতার লক্ষণ। যে দল জনগণকে যুক্তি দিয়ে নিজের পক্ষে নিতে পারে না, সে দলই শেষ পর্যন্ত ভয় দেখানোর প্রয়োজন অনুভব করে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও