‘আমাদের স্যার’ থেকে ‘আমাদের রাষ্ট্রপতি’
রাজনীতি থেকে সত্যই আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর! ‘সত্য যে কঠিন,/ কঠিনেরে ভালোবাসিলাম/ সে কখনো করে না বঞ্চনা।’ বিদায়বেলায় তাঁর কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থের উল্লিখিত বিখ্যাত পঙ্ক্তিগুলো মনে পড়ছিল?
রাজনীতির বাইরে শিল্প-সাহিত্য, সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে যখনই আলোচনা করেন, বারবার তাঁর কণ্ঠ রবীন্দ্রনাথের প্রতি নিবেদন করে এক অনবদ্য নৈবেদ্য। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তাই তাঁর প্রিয় সাহিত্যিকের শরণাপন্ন হতে হলো। এ মুহূর্তে এই পঙ্ক্তিগুলোই আসলে তাঁর জীবনের সারবত্তা।
রাজনীতিক হিসেবে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিত্ব, সততা, মার্জিত রুচিবোধ এবং নেতৃত্বের সহজাত গুণে দলমত–নির্বিশেষে শ্রদ্ধেয় ও বরেণ্য হওয়ার এক বিরল সম্মান মির্জা ফখরুল অর্জন করেছেন। তাঁর মতো জননন্দিত জাতীয় নেতার রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করার মাহাত্ম্য তাই অপরিসীম।
মির্জা ফখরুল দ্য ‘ন্যাশনাল ক্রাইসিসম্যান’
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে পদচ্যুত করার বহু চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী হঠকারিতার সময়ে সাংবিধানিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিএনপি ছিল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসব ব্যাপারে তখন মির্জা ফখরুলের বিচক্ষণতাবোধ, দূরদর্শিতা এবং সংবিধান, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে বোঝার অমিত দক্ষতা বহু দক্ষিণপন্থী বিপদ থেকে বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছে।
নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদীয় আসন জিতেও বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে তাড়াহুড়ো করেনি। রাষ্ট্রপতিকে সম্মানজনক বিদায়ের পথ করে দিয়েছে। বিরোধীদের ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও অভিশংসনের পথে যায়নি। বিএনপির এই ‘ধীরে চলো’ নীতি রাজনৈতিক পরিপক্বতার দারুণ দৃষ্টান্ত।
এ জন্যই রাষ্ট্রপতি পদে অরাজনৈতিক ও দলনিরপেক্ষ কাউকে বিবেচনা না করা বিএনপির আরেকটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যে সময় বাংলাদেশ অতিক্রম করছে, তাতে রাষ্ট্রপতি পদে একজন প্রজ্ঞাবান বর্ষীয়ান রাজনীতিকের প্রয়োজন ছিল, যিনি নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে বিচক্ষণ ও সর্বজনগ্রাহ্য।
বিএনপি নানা রাজনৈতিক সমীকরণও মিলিয়েছে। প্রথমত, ২০৩১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পাঁচ বছর পূর্ণ হবে এবং ২০৩১ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত থাকবে নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ। দ্বিতীয়ত, সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য অত্যাসন্ন। তৃতীয়ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এসেছে। এসব মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি হয়ে উঠবেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অপরিহার্যতা বর্তমান বাংলাদেশে তুলনাতীত।
বলা বাহুল্য, জনমত জরিপ হলেও তিনি সবচেয়ে এগিয়ে থাকতেন। নির্বাচনের পর শুধু এলাকায় নয়, রাষ্ট্রপতি পদে এ নামটিই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে। কেননা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞতায় তিনি নিজেকে ‘দ্য ন্যাশন্যাল ক্রাইসিসম্যান’ হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
ফলে, একদিকে কার্যোপযোগী রাজনৈতিক পন্থা, আরেকদিকে গগণচুম্বি গণআকাঙ্ক্ষা—এ দুইয়ের দৃঢ় মেলবন্ধন ঘটিয়ে বিএনপি হাইকমান্ড গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে গেল। রাষ্ট্রপতি পদটিও যেন বহুদিন পর তার হৃতগৌরব ও স্বীয়মর্যাদা ফিরে পেল।