নাগরিকেরা সুস্থ জীবনের অধিকার কবে পাবে
ঢাকার অভিজাত এলাকার এক আধুনিক বাড়িতে একটি হারিকেন দেখতে পাই। হারিকেনটি দেখতে বেশ সুন্দর ছিল। হারিকেন তো দুটি কাজে লাগে। একটি হচ্ছে লোডশেডিংয়ের সময় আলো দেয়, আরেকটি হচ্ছে মশা থেকে রক্ষা করে। দুটি জলজ্যান্ত সমস্যা এ সময়ের। একটি বিদ্যুৎ, অন্যটি মশা। দুটি সমস্যারই একটা উপসংহার হয়ে গেছে। বিদ্যুতের সমস্যা থাকবেই এবং আমাদের সহ্য করে যেতে হবে। মশার সমস্যাও সমাধানের অনেক চেষ্টা করা হয়েছে, এখন আর এর কোনো সমাধান নেই। মশার কামড় খেতে হবে, ম্যালেরিয়া হবে, ডেঙ্গু হবে এবং মশার কামড় খেয়ে খেয়ে আমাদের বাকি জীবন এবং পরবর্তী প্রজন্মকেও সহ্য করে যেতে হবে। সহনশীলতার দিক থেকে আমাদের জাতি খুবই উঁচুমানের। আমরা অনেক কিছু সহ্য করতে পারি। আবার একসঙ্গে প্রতিবাদও করতে পারি। আমাদের প্রতিবাদে সরকার পতন হয়, নতুন সরকার আসে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না। একই জায়গায় থেকে যায়। আমরা মুখে যেকোনো সমস্যার সমাধান করে ফেলি। কিন্তু কার্যত আমরা নিজেরা সমস্যার সমাধানে হাত লাগাই না। দোষারোপ করতেও একই রকম দক্ষতা আমাদের আছে। এসব ক্ষেত্রে অতীতের সরকারগুলোর ওপর দোষ চাপিয়ে আমরা একটা আত্মতৃপ্তি লাভ করি।
একবার ইউরোপের একটি দেশে এক তরুণকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আচ্ছা, তোমাদের দেশে বিদ্যুৎ কয়বার যায়? ছেলেটি বেশ চিন্তা করে বলল, ‘আমার জীবনে দু-একবার যেতে দেখেছি। সেটা হচ্ছে মেইন সুইচের তারটি হঠাৎ করে পুড়ে যাওয়ার কারণে। তখন বিদ্যুৎ চলে গেছে। কিন্তু আবার নতুন করে তারটি লাগিয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যায়।’ আমি বোঝাবার চেষ্টা করি যে উৎস থেকে কবার বিদ্যুৎ যায় এবং সারা এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। এ কথার অর্থ সে বুঝতেই পারল না। অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। এবারে হংকংয়ে এক তরুণীকে একই প্রশ্ন করলাম, তাকেও বললাম, তোমাদের এখানে তো ঝড়-বৃষ্টি হয়; তখনো বিদ্যুৎ থাকে? বেচারি চিন্তিত হয়ে পড়ল। কিন্তু উত্তরটি দিল খুবই বুদ্ধিদীপ্ত। ‘বিদ্যুৎ যদি চলে যায় তাহলে জীবন কী করে চলবে? ট্রেন বন্ধ হয়ে যাবে, মানুষের ঘরবাড়ি অন্ধকার হয়ে যাবে, কল-কারখানা চলবে না; এটা কেমন করে হয়? বিদ্যুৎ তো মানুষের জীবনপ্রবাহ। জীবনপ্রবাহ বন্ধ করে মানুষ বাঁচে কি? বাঁচে না।’ সে আরও জানাল, তার জীবদ্দশায় এ রকম ঘটেনি। হ্যাঁ একবার আধা ঘণ্টার জন্য সারা দেশের বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে গেছিল। একটা টাইফুনের কারণে।
জাপানে একবার মশা আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছিলাম। দেখা গেল, মশা-মাছি তো দূরের কথা, কাক পর্যন্ত নেই! অনেক খুঁজেও কাক দেখতে পেলাম না। কাক হয়তো তার খাবার খুঁজে না পেয়ে অনেক আগেই দেশ ছেড়ে চলে গেছে। ওই দেশের মানুষের জন্য দুঃখই হলো, কাকের মতো একটি শৈল্পিক প্রাণী তারা দেখতে পায় না। এই কাককে নিয়ে কত ধরনের ছড়া, কবিতা এবং ছবি আঁকা হয়েছে। আর বেচারারা মশার কামড় খেতে হলে এই উপমহাদেশে আসতে হয়। বিদ্যুৎবিহীন ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রকৃতিকে উদ্যাপন করতে হলে এখানে আসতে হয়। মশা একটি অত্যন্ত ক্ষমতাবান প্রাণী। পুলিশ, মিলিটারি এসবকে তারা ভয় পায় না। মাত্র আড়াই দিনের জীবন তাদের, এ ক্ষুদ্র জীবন পরিপূর্ণ ভোগ করে মৃত্যুবরণ করে। কথিত আছে, বিশ্ববিজয়ী বীর আলেকজান্ডারকে এক কামড়েই হত্যা করেছিল। তাই কোনো কিছুকেই তার ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। তাকে বিনাশ করার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি হচ্ছে, মশারি তৈরি করার জন্য নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠছে, কিন্তু তার ফাঁক দিয়েও সে ঢুকে পড়ে মানুষের রক্ত পানের আদিম ক্ষুধা মেটাচ্ছে। তাই আমাদের যথেষ্ট ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এটা মেনেই নিচ্ছি যে বিদ্যুৎ থাকবে না, আর মশা আমাদের নিপীড়ন করে হত্যা করবে।
তবে মাঝে মাঝে অলস মস্তিষ্কে প্রশ্ন জাগে ওরা পারে, আমরা পারি না। ওরাও তো রক্তমাংসের মানুষ আমরাও তাই। ওরা কী করে পারল বিরতিহীন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে। মশা মারতে কামান না দেগে কেমন করে মশাকে অদৃশ্য করে দিল! আবার প্রতিদিন ঘর থেকে বেরোলেই ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরি। প্রবল যানজটের কারণে। তাইবা ওরা কী করে পারল একটা সুশৃঙ্খল যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে। মনে মনে প্রশ্ন করতে করতে, একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। এটাই আমাদের আজন্মের চর্চা। একসময় সমস্বরে বলে উঠি, এ দেশ বাসযোগ্য নয়, এ শহর মানুষের জীবনযাপনের যোগ্য নয়। আর তরুণ শিক্ষার্থীরা সব সময়ই খুঁজছে, কী করে বিদেশ যাওয়া যায়। গ্রামের সম্পন্ন গৃহস্থের সন্তানটিও লিবিয়ার অত্যাচারের কাহিনি শুনে সমুদ্রে ভেলা ভাসিয়ে ইতালির কোনো এক উপকূলে পৌঁছে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। রাষ্ট্রের কাজে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের কর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন ভাবনা একটাই, ঢেউ গুনে কী করে পয়সা কামানো যায়। কতটা ফাঁকি দিতে পারলে কাজে প্রমোশন হয়, কাজে প্রমোশন হলে জনপ্রতিনিধিদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য কত বুদ্ধি ব্যয় করতে হয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- নাগরিক অধিকার
- সুস্থ জীবন