বিদেশে প্রবাসী, দেশে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি আজ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশে কর্মরত প্রায় দেড় কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রতিনিয়ত কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চগুলোর একটি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় না, বরং লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা। দেশের বাইরে থাকা অনেক প্রবাসী বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে যে অর্থ উপার্জন করেন, দেশে ফিরে এসে তার বড় একটি অংশ হারিয়ে ফেলেন নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষদের কারণেই। বিষয়টি শুনতে যতটা কষ্টের, বাস্তবে তা আরও বেদনাদায়ক।
প্রবাসীদের সঙ্গে কাজ করা আইনজীবী, আর্থিক পরামর্শক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রায়ই এমন অভিযোগ আসে যে, বিদেশে থাকা অবস্থায় পরিবার বা আত্মীয়দের ওপর বিশ্বাস করে জমি কেনার জন্য টাকা পাঠানো হয়েছে, কিন্তু পরে দেখা গেছে, জমির দলিলে নিজের নামই নেই। কেউ ব্যবসার জন্য লাখ লাখ টাকা পাঠিয়েছেন, কয়েক বছর পর দেশে ফিরে জানতে পেরেছেন, সেই ব্যবসার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার অনেকে ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য অর্থ পাঠিয়েছেন, কিন্তু সেই টাকা কখনো ব্যাংকে জমাই হয়নি। এমন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে আগে থেকেই স্বাক্ষর করা চেক ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। সব পরিবার এমন নয়, কিন্তু এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা যে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, তা বিভিন্ন গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট।
অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Refugee and Migratory Movements Research Unit (RMMRU) বহু বছর ধরে প্রবাসীদের আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। সংস্থাটির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আর্থিক সাক্ষরতার অভাব, সম্পদের আইনি সুরক্ষা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং অতিরিক্ত পারিবারিক নির্ভরশীলতা প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। একই ধরনের পর্যবেক্ষণ করেছে জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা International Organization for Migration (IOM)। সংস্থাটি তাদের আর্থিক সচেতনতা-বিষয়ক নির্দেশিকায় বলেছে, বিদেশে গিয়ে শুধু অর্থ উপার্জন করাই যথেষ্ট নয়; সেই অর্থ কীভাবে নিরাপদ রাখা হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসীদের একটি বড় অংশ পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নিজের সব আয় দেশে পাঠিয়ে দেন। অনেকেই নিজের জন্য কোনো সঞ্চয় রাখেন না, কোনো অবসর পরিকল্পনা করেন না, এমনকি জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করার মতো অর্থও হাতে রাখেন না। দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে যখন বুঝতে পারেন যে তাঁদের উপার্জিত অর্থের বড় অংশ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি, তখন অনেকের সামনে নতুন করে জীবন শুরু করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ বৈধ পথে পাঠানো অর্থ নিরাপদ হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে তার প্রমাণও সংরক্ষিত থাকে। অন্যদিকে হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে অর্থ পাঠালে শুধু দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, প্রবাসীর নিজের অর্থও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি, ব্যাংক নথি ও আইনি কাগজপত্র সংরক্ষণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন আর্থিক বিশেষজ্ঞরা।
প্রবাসীদের অধিকাংশেরই একটি বড় স্বপ্ন থাকে—দেশে নিজের নামে একটি বাড়ি বা একটি ফ্ল্যাট। কারণ বিদেশের জীবন চিরস্থায়ী নয়। একসময় সবাই ফিরে আসতে চান নিজের দেশে, নিজের ঠিকানায়। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই সবচেয়ে বেশি প্রতারণার ঘটনা ঘটে। কখনো জাল দলিল, কখনো একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, কখনো অনুমোদনহীন প্রকল্প, আবার কখনো নির্মাণকাজ বছরের পর বছর শেষ না হওয়ার কারণে অনেকের স্বপ্ন ভেঙে যায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ভবিষ্যৎ
- প্রবাসী বাংলাদেশি