ঢাকা মহানগরের ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজকে দেখভালের জন্য গঠিত হয়েছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইন, ২০২৬’ পাস হওয়ার পর সেটি গেজেট আকারেও প্রকাশিত হয়েছে। উপাচার্যসহ বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু এই সাত কলেজ ঘিরে উদ্ভূত সমস্যার কি সমাধান হয়েছে?
পত্রিকার পাতা খুললে এই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন নতুন খবর চোখে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে চলছে বহুমুখী আন্দোলন। ফলে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আশঙ্কা—ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি গঠনের উদ্যোগ কি সত্যিই সাত কলেজের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করবে, নাকি এটি আগের মতোই নতুন কোনো সমস্যার সূচনা মাত্র?
এই সাত কলেজকে ঘিরে বিগত কয়েক বছর ধরে যে ধরনের মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা হয়েছে, সেটি রীতিমতো অবিশ্বাস্য। ২০১৭ সালে তৎকালীন সরকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজকে বের করে নিয়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করে। যদিও নব্বইয়ের দশকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে এসব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই ছিল; কিন্তু ২০১৭ সালে কোনো ধরনের গবেষণা, প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া আবার কেন এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটি এক রহস্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার কারণ হিসেবে শিক্ষার মান বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তার ছিঁটেফোঁটাও দেখা যায়নি। বরং এ কথা প্রচলিত আছে যে, সে সময় এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এই অধিভুক্তির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কারণ যাই হোক, সিদ্ধান্তটি যে প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনেনি, সেটি তো দেখাই যাচ্ছে।
কলেজগুলোতে ভর্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা থেকে শুরু করে পরীক্ষা গ্রহণ, মূল্যায়ন ও কলেজ পরিদর্শনের মতো মৌলিক কাজগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করতে পারেনি। কারণ এই সাত কলেজ কলেবরে এত বড় যে, এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে যে পরিমাণ লোকবল ও দক্ষতার দরকার ছিল, তার ব্যবস্থা করা যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নামকাওয়াস্তে সনদ দেওয়া ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
উল্টো একদিকে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত সেশনজট, পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব ও অনিশ্চিত রুটিনের চাপে পড়েছে; অপরদিকে কলেজগুলোর গায়ে এই বদনাম লেগেছে যে, এখানে একবার ভর্তি হলে আর পাস করে বেরোনো যায় না—এ যেন এক অনন্ত শিক্ষাজীবন! আবার সাত কলেজের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রশাসনিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এসব থেকেই জন্ম হয়েছে ক্ষোভের। সেই ক্ষোভ থেকে শিক্ষার্থীরা বারবার রাস্তায় নেমেছে। শুধু সময়মতো পাস করে বেরোনোর দাবিতে শিক্ষার্থীদের যখন রাস্তায় নামতে হয়, এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে?
এই যখন পরিস্থিতি, তখন ২০২৪ সালের অগাস্টে তৎকালীন সরকার ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ হয়। সাত কলেজ নিয়ে নানা অসন্তোষ সামনে আসতে শুরু করে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সব স্বার্থান্বেষী মহল এসে পেছনে ভিড় করে। শহরের নানা জায়গায় শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে। দিনের পর দিন রাস্তা অবরোধ থেকে ক্লাস বর্জন—কী হয়নি? সেসব আন্দোলনের চাপে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাত কলেজকে বের করে নিয়ে আসার ঘোষণা দেয়। জানানো হয়, ‘জুলাই ৩৬ বিশ্ববিদ্যালয়’ বানিয়ে এই সাত কলেজকে তার হাতে তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু সমালোচনার মুখে তা বাতিল করে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে পরিচালনার কথা জানানো হয়। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তও পরিবর্তন করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা এখন আইনে পরিণত হয়েছে।
এই হলো সাত কলেজকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এখন প্রশ্ন হলো, একটা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে তুলে দিলেই কি সাত কলেজকে ঘিরে পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? এই কাজটিই তো ২০১৭ সালে করা হয়েছিল, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। লাভ কি কিছু হয়েছে?
এসব নিয়ে আলোচনার আগে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইনের কয়েকটি প্রধান ধারায় চোখ বুলানো যাক। আইনের ধারা ২(২৪) ও ৩(৪) বলছে, এই সাত কলেজ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এই ইউনিভার্সিটি কলেজগুলোর জন্য পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদপত্র প্রদান করবে। আইনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত কলেজের পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। ধারা ২(১) এবং ৫৮ অনুযায়ী, অধ্যক্ষ কলেজের প্রশাসনিক নেতৃত্বে থাকবেন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় হবে এর নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ।
তাহলে এখন সমস্যাটা কী নিয়ে হচ্ছে? মোটা দাগে সমস্যা দুটো।
আইনের ৫৯(৪) ধারা অনুযায়ী ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি শুধুমাত্র ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের শর্তসাপেক্ষে সনদ প্রদান করবে। তার আগের শিক্ষাবর্ষের পড়াশোনা শেষ করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু অভিযোগ এসেছে, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় আগের তিন সেশনের শিক্ষার্থীদেরকেও তাদের অধীনে আনার চেষ্টা করছে। এখন শিক্ষার্থীরা বলছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোই এখনো ঠিক হয়নি—দক্ষতা তো দূরের কথা, লোকবল নিয়োগও সম্পন্ন হয়নি—তাদের অধীনে গিয়ে আমরা কি নতুন করে বিপদে পড়ব নাকি? এই ইউনিভার্সিটির দেওয়া সার্টিফিকেট কি দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে?
দ্বিতীয় দিকটি হলো অবিশ্বাস। নানা ধরনের গোষ্ঠি বৃহৎ পরিসরের এই কলেজগুলোর সঙ্গে জড়িত। ফলে তারা আশঙ্কা করছে, ক্রমান্বয়ে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এই কলেজগুলো দখল করবে এবং বর্তমান কাঠামো ভেঙে দিয়ে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করবে।
এই অবিশ্বাস থেকেই মূলত সমস্যার সূত্রপাত। প্রায় ১,৩০০ শিক্ষক বর্তমানে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের আওতায় এসব কলেজে কর্মরত। তাদের আশঙ্কা, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেলে নির্ঘাত তাদের চাকরি যাবে; কারণ কলেজের শিক্ষক দিয়ে তো আর বিশ্ববিদ্যালয় চলবে না!