গোল্ডেন জিপিএর চেয়ে ‘গোল্ডেন মানুষ’ জরুরি
এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের দিন আমাদের সমাজে যেন একটি অদৃশ্য বিভাজনরেখা টানা হয়। এক পাশে উল্লাস, ফুল, মিষ্টি, ছবি, অভিনন্দন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাফল্যের প্রদর্শনী; অন্য পাশে নীরবতা, হতাশা, অপরাধবোধ এবং ‘আমি পারিনি’—এই ক্ষতবিক্ষত অনুভূতি।
অথচ এই দুই পাশেই আছে ১৫-১৬ বছরের কিশোর-কিশোরী। কয়েকটি বিষয়ের কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষার ফল দিয়ে আমরা যেন মুহূর্তেই একজন মানুষের সম্ভাবনার দাম নির্ধারণ করে ফেলি। এই জায়গায়ই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।
পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। অন্যদিকে ছয় লাখ ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এই বিপুল সংখ্যাকে শুধু ‘ফেল’ বলে একটি কলামে ফেলে রাখলে আমরা আসলে শিক্ষাব্যবস্থার দায় অনেকটাই শিক্ষার্থীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিই।
ফল খারাপ হয়েছে কেন—এ প্রশ্ন অবশ্যই জরুরি। এবারের ফল বিশ্লেষণে ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা, মানবিক বিভাগের পিছিয়ে থাকা, শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ধাক্কা, শ্রেণিকক্ষের শিখনঘাটতি এবং মূল্যায়নপদ্ধতির পরিবর্তনের মতো বিষয় সামনে এসেছে। ৯টি সাধারণ বোর্ডেই পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হয়নি। এগুলো কোনোভাবেই হালকা করে দেখার বিষয় নয়।
কিন্তু আরো বড় প্রশ্ন হলো, ১০ বছর স্কুলে যাওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী কী শিখল? সে কি যুক্তি করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, অন্যের মতকে সম্মান করতে পারে, সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে পারে, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে?
আমরা দীর্ঘদিন ধরে ‘ভালো ছাত্র’ আর ‘ভালো মানুষ’কে প্রায় সমার্থক ধরে নিয়েছি। ভালো ছাত্র মানে বেশি নম্বর, জিপিএ ৫, নামি কলেজ, পরে নামি বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু জীবনের পরীক্ষায় নম্বরপত্রের বাইরেও অনেক বিষয় থাকে—সততা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা, ন্যায়বোধ, পরিশ্রম, কৃতজ্ঞতা, ব্যর্থতা সামলানোর ক্ষমতা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার শিক্ষা। এগুলোর কোনোটি এসএসসির ট্রান্সক্রিপ্টে আলাদা গ্রেড পায় না। অথচ পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবখানেই শেষ পর্যন্ত এই গুণগুলোর পরীক্ষাই সবচেয়ে বেশি দিতে হয়।
জিপিএ ৫ অবশ্যই একটি অর্জন। যারা পেয়েছে, তাদের অভিনন্দন প্রাপ্য। তাদের পরিশ্রমকে ছোট করার কোনো সুযোগ নেই। সমস্যা জিপিএ ৫-এ নয়, সমস্যা তখনই, যখন আমরা এটিকে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের সনদ বানিয়ে ফেলি। ‘গোল্ডেন জিপিএ’ শব্দবন্ধটি আমাদের সামাজিক অভিধানে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে অনেক পরিবারে সন্তানের ফল যেন পরিবারের সম্মান-মর্যাদার প্রতিযোগিতার অংশ। প্রতিবেশীর সন্তান কী পেল, আত্মীয়র ছেলেমেয়ে কোথায় ভর্তি হলো—এই তুলনা কিশোরদের ওপর এমন এক চাপ তৈরি করে, যেখানে শেখার আনন্দ হারিয়ে যায়; থেকে যায় শুধু নিজেকে প্রমাণ করার বাধ্যবাধকতা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- নৈতিক শিক্ষা