বদলেছে মশা, আমাদের কৌশল কি বদলেছে?
২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস। ১৮৯৭ সালের এই দিনে ব্রিটিশ চিকিৎসাবিজ্ঞানী স্যার রোনাল্ড রস বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেছিলেন যে স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়ার জীবাণু মানুষের শরীরে বহন করে। তার এই যুগান্তকারী আবিষ্কার মশাবাহিত রোগের সংক্রমণ সম্পর্কে মানুষের ধারণায় আমূল পরিবর্তন আনে এবং আধুনিক ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি শক্তিশালী করে।
সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ১২৯ বছর পরও মশাবাহিত রোগ বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। ম্যালেরিয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু এখন দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে।
একসময় ডেঙ্গুকে মূলত একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বর্ষা এলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে এবং শীতের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এমন একটি ধারণা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মধ্যে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব, নির্মাণকাজের বিস্তার এবং মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গু এখন আর শুধু কয়েক মাসের সমস্যা নয়।
বর্ষাকালে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে গেলেও বছরের অন্যান্য সময়েও রোগী শনাক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ ডেঙ্গুর বাহক এডিস ইজিপ্টাই আমাদের নগর পরিবেশে এমনভাবে অভিযোজিত হয়েছে যে রোগটির ঝুঁকিও ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এ বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, ডেঙ্গু কি এখন বাংলাদেশের স্থায়ী জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে? উত্তরটি সরল নয়, তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা আমাদের সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ দিচ্ছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রচলিত মৌসুমি প্রস্তুতি যদি একইভাবে চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
কয়েক বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে, শুধু রোগীর চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। হাসপাতালে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা, চিকিৎসক ও নার্সের প্রস্তুতি, জরুরি ওষুধ সরবরাহ, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য চিকিৎসা নির্দেশিকা এবং হাসপাতালভিত্তিক নজরদারি, সবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো মূলত রোগ দেখা দেওয়ার পরের ব্যবস্থা। রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই যদি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়, সেটিই হবে অধিক কার্যকর এবং টেকসই জনস্বাস্থ্য কৌশল।
তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রোগের বাহককে নিয়ন্ত্রণ করা। অর্থাৎ এডিস ইজিপ্টাই মশার ঘনত্ব কমানো, এর প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করা এবং প্রয়োজনে বিজ্ঞানসম্মতভাবে মশার প্রজনন ও বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা। ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি ভেক্টর নিয়ন্ত্রণকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।