জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারছেন তিনি
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বিএনপি ২১২ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। নির্বাচনের ৫ দিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এ হিসাবে ১৭ আগস্ট পূর্ণ হয়েছে সরকারের ৬ মাস। ৪৮ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৫ মন্ত্রী ও ২৩ প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১৮০ দিনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের বিভিন্ন খাতে বহুবিধ উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছে সরকার।
সুনির্দিষ্টভাবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে : প্রথম ৬ মাসের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ বা অধিকাংশ পূর্ণ হয়েছে। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষকদের কৃষিঋণ ও সুদ মওকুফ করা হয়, যার সুফল পান প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবার। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও প্রবাসীর কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মাননার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিনিয়োগ ও শ্রমবাজার নিয়ে চুক্তি ও আলোচনা হয়েছে।
সরকারের এ দাবির বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলো বলেছে, গ্যাস ও জালানি সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি নিয়ে বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছে। তারা অভিযোগ করেছে, সরকার তাদের প্রথম ৬ মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রবণতা রয়েছে।
সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান থেকে যা কিছু দাবি করা হোক না কেন, তারপরও একটি বড় কথা থেকে যায়। প্রশ্ন হলো, কী অবস্থায় বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে? ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেখা গেল রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া একেবারে ধসে পড়েছে এবং অকার্যকর হয়ে গেছে। ডারন এসেমগলু ও রবিনসনস তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Why Nations Fail’-এ দেখিয়েছেন, যে জাতির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে, সে জাতি ব্যর্থ হয়ে যায় বা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। লেনিনের ভাষায় রাষ্ট্র বলতে আমরা বুঝি সামরিক বাহিনী, পুলিশ, আমলাতন্ত্র, কারাগার, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচার বিভাগ। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অবলোকন করি তাহলে প্রথমত দেখব, সামরিক বাহিনীতে কী ধরনের ক্ষতিকর সংক্রমণ ঘটেছিল।
২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর বেশ কিছুসংখ্যক উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার ভারতে পালিয়ে যায়। এদের মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানও রয়েছেন। এই যদি হয় একটি দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার অবস্থা, তাহলে সেই দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অনেকটা আকাশে ভাসমান খেলনা বেলুনের মতো হয়ে যায়, যা সূক্ষ্ম একটি ফুটোতেই চুপসে পড়ে। এছাড়া উচ্চপদস্থ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। এদের কেউ কেউ এখন বন্দিদশায় রয়েছেন এবং বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। আরও উদ্বেগের বিষয়, কতিপয় সামরিক কর্মকর্তা অভ্যুত্থান-উত্তর অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ক্যু করতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তবে এটাই সামরিক বাহিনীর প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। সামরিক বাহিনীর দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রমনা সদস্যরা শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী ছাত্র-জনতাকে খুন করতে চায়নি। তারা ছাত্র-জনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ফ্যাসিবাদী ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।
অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল পুলিশবাহিনী ও তাদের অনেক অফিসার। বস্তুত পুলিশবাহিনী ছিল ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ঠেঙাড়ে বাহিনী। হাসিনার মসনদকে চিরস্থায়ী করার প্রয়াসে এদের ছলাকলা ও কৌশলের অন্ত ছিল না। এরা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার হয়রানিমূলক, ফরমায়েশি মামলা দায়ের করে ক্ষতবিক্ষত করেছে। সরকারবিরোধীদের অনেককে গুম করা হয়েছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকারে পরিণত করা হয়েছে। অনেককে তুলে নিয়ে গিয়ে আয়নাঘরে বছরের পর বছর নিরুদ্দেশ হিসাবে বন্দি করে রাখা হয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- নতুন সরকার
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান