অপারেশন জ্যাকপট: ঢেউয়ের ভেতর লুকানো বিস্ফোরণ
একাত্তরে পুরো দেশ যখন পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত, তখন ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামক প্রতিরোধের এক অন্য রকম ঢেউ নীরবে জেগে উঠেছিল নদী ও সমুদ্রের গাঢ় অন্ধকারে। ১৬ অগাস্ট ১৯৭১। প্রথম প্রহরেই দেশের দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মোংলা এবং দুটি নদীবন্দর চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে (দাউদকান্দি ফেরিঘাটসহ) সমন্বিত আক্রমণ চালায় নৌ-কমান্ডোরা। একযোগে পরিচালিত ওই আত্মঘাতী অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন জ্যাকপট’। এই অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর ২৬টি সমরাস্ত্র ও পণ্যবাহী জাহাজ এবং গানবোট ডুবিয়ে দেওয়া হয়। নৌ-কমান্ডোদের এই সফল অপারেশনে বদলে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের গতিপথ।
বিশেষ এই অপারেশনের অন্তরালের গদ্য তুলে আনতে বিভিন্ন সময়ে মুখোমুখি হয়ে কথা বলি জ্যাকপটের তিন নৌ-যোদ্ধার সঙ্গে। অপারেশন জ্যাকপটের বাছাই, প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও ঐতিহাসিক আক্রমণ নিয়ে তাদের বলা কথাগুলোই ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে এবং থাকবে। যা বাঙালির বীরত্বের ইতিহাসকেও গৌরবোজ্জ্বল করে তুলেছে।
এটা ছিল সুইসাইডাল স্কোয়াড
অপারেশন জ্যাকপট কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল? তা জানতে একবার মুখোমুখি হই নৌ-কমান্ডো মো. শাহজাহান কবির (বীরপ্রতীক) এর। একাত্তরে চাঁদপুর নদীবন্দর অপারেশনে অংশ নেওয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “এটি ছিল সুইসাইডাল অপারেশন। ট্রেনিংয়ের পর ৩০০ জনের ভেতর থেকে সিলেকশন করা হয় ১৬০ জনকে। চট্টগ্রামের জন্য ৬০ জন, মোংলার জন্য ৬০ জন, চাঁদপুরে ২০ জন ও নারায়ণগঞ্জের জন্য ২০ জন করে নৌ-কমান্ডো গ্রুপ তৈরি করা হয়। ওইসময় ফ্রান্স ফেরত সাবমেরিনার এ ডব্লিউ আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরীকে (বীরউত্তম ও বীরবিক্রম) চট্টগ্রাম, আহসান উল্লাহকে (বীরবিক্রম) মোংলায়, বদিউল আলমকে (বীরউত্তম) চাঁদপুর এবং নারায়ণগঞ্জ অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয় আবেদুর রহমানকে।
৯ অগাস্ট চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ—এই তিনটি গ্রুপকে ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে সামরিক বিমানে আনা হয় আগরতলায়, শালবনের ভেতর নিউ ট্র্যানজিট ক্যাম্পে। ওখান থেকে বাংলাদেশে ঢুকে অপারেশন সেরে ওখানেই ফিরতে হবে। একদিন পরেই দেওয়া হয় আর্মস-অ্যামুনেশন। প্রত্যেকের জন্য একটা লিমপেট মাইন, একটা কমান্ডো নাইফ, একজোড়া ফিনস, থ্রি নট থ্রিসহ কিছু অস্ত্র এবং প্রতিটি গ্রুপের জন্য একটা টু ব্যান্ডের রেডিও।
রেডিও হলো যুদ্ধে সিগন্যাল পাঠানোর মাধ্যম। গানে গানে সিগন্যাল! শাহজাহান কবিরের ভাষায়, “আমরা চাঁদপুর আসি ১১ অগাস্টে, উঠি রঘুনাথপুরে এক মামার বাড়িতে। অতঃপর রেডিওতে নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকি।
বলা ছিল, ‘প্রত্যেকদিন তোমরা আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র ধইরা রাখবা। ওটার মাধ্যমে সিগন্যাল পাবা’। কেমন সিগন্যাল? আকাশবাণীতে সকাল ৭ বা সাড়ে ৭টায় বাজবে একটি গান, ‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান’। এ গান হলেই অপারেশনের যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। ২৪ ঘন্টা পর আরেকটা গান বাজবে, ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুর বাড়ি’। এ গানটি বাজলেই বুঝতে হবে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ওই দিন শেষে রাত বারোটার পর অবশ্যই অ্যাটাক করতে হবে।
১৩ অগাস্ট সকালে বাজল প্রথম গানটি। আমি, নুরুল্লাহ পাটোয়ারী, বদিউল আলম সঙ্গে সঙ্গে রেকি করতে বের হই। ২৪ ঘন্টা পর অর্থাৎ ১৪ অগাস্ট চূড়ান্ত নির্দেশনার গানটি বাজার কথা ছিল। কিন্তু ওইদিন সেটি না বেজে বাজল ১৫ অগাস্ট সকালে। ফলে আমরা অ্যাটাকের প্রস্তুতি নিই।
১৯৭১: চাঁদপুরে কীভাবে নৌ-কমান্ডো অপারেশন হয়েছিল?
লঞ্চ টার্মিনাল ও স্টিমার ঘাটসহ ছয়টি টার্গেট প্লেস ঠিক করি। আমার টার্গেট প্লেস ছিল লন্ডনঘাট জেটি। রাত সাড়ে এগারটার দিকে ডাকাতিয়া নদী দিয়ে নামি। পায়ে ফিনস, পরনে শুধু জাঙ্গিয়া। বুকে গামছা দিয়ে মাইন পেচিয়ে চিত সাঁতারে এগোই। এভাবে লন্ডনঘাটে এসেই জেটিতে মাইন সেট করে দিই। ৪৫ মিনিট পরই সেটার বিস্ফোরণ ঘটে।”
মাইন ছাড়া অস্ত্র ছিল শুধু একটি কমান্ডো নাইফ
মুক্তিযোদ্ধা নৌ–কমান্ডো মো. মতিউর রহমান (বীরপ্রতীক)। বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার সাতঘড়িয়া গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণগাঁও হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। জীবদ্দশায় আলাপ হয়েছিল তার সঙ্গে।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ট্রেনিং নিতে তিনি চলে যান ভারতের বনগাঁ, টালিখোলা ক্যাম্পে। প্রায় দুই সপ্তাহ লেফট–রাইট আর ক্রলিং করানো হয় ওই ক্যাম্পে। তিনি বলেছিলেন যেভাবে, “ওই ক্যাম্পে একদিন আসেন ওসমানী সাহেব। সঙ্গে ছিলেন ভারতীয় নৌ–বাহিনীর প্রধান। একাত্তরে আটজন বাঙালি সাবমেরিনার জাহাজ আনতে গিয়েছিলেন ফ্রান্সে। তারা ওখান থেকেই পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে পালিয়ে চলে আসেন ভারতে। তারাও ওইদিন ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আসেন। প্রথমে সবাইকে ফল–ইন করানো হয়। পরে বাছাই করা হয় ৬০ জনকে। মেডিকেল টেস্টে বাতিল হয় ২০ জন। আমিসহ ৪০ জনকে বলা হলো একটা গ্রুপ করা হবে, যারা অপারেশনে গেলে মরতেও হতে পারে। আমরা রাজি হয়ে যাই, ‘মরতে হলে দেশের জন্য মরমু।’