আইনের ফাঁদে মাতৃত্ব: অভিভাবকত্ব নাকি জিম্মাদারি?

বিডি নিউজ ২৪ ফজিলাতুন নেসা শাপলা প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০৬

সন্তান কি কেবল বাবার বংশ পরিচয়ের দলিল, নাকি মায়েরও সমান অধিকার তার ওপরে? বিচ্ছেদের পর একজন মাকে যখন তার গর্ভজাত সন্তানের ওপর তারও অধিকার আছে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর জুতো ক্ষয় করতে হয়, নয়তো সন্তান নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়, তখন আমাদের আইনি ও সামাজিক ব্যবস্থার নির্দয় অবস্থাটা বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাতৃত্ব যেখানে এক গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবকের নাম, এমনকি মা স্বাবলম্বী ও স্বনির্ভর হওয়ার পরও সমাজ আর আইন কীভাবে একজন মাকে সন্তানের অভিভাবকত্ব থেকে বঞ্চিত করে—সেই রূঢ় বাস্তবতার দিকে নজর দেওয়ার সময় এখন।


বাংলাদেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামোয় একজন নারীর জন্য ‘ডিভোর্সড’ তকমাটি এমনিতেই এক বিশাল সামাজিক অভিশাপ। আর এই বিচ্ছেদের পর যদি সন্তানের হেফাজত (Custody) ও অভিভাবকত্ব (Guardianship) ইস্যু সামনে আসে, তবে সেই লড়াইটি সাধারণ কোনো ‘আইনি যুদ্ধ’ থাকে না; তা রূপ নেয় ভীষণ মানবেতর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সন্তান নিয়ে মায়েদের আইনি লড়াই এবং তাদের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাগুলো নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—রাষ্ট্র, সমাজ এবং আইন কি আদৌ একজন মায়ের মাতৃত্বকে সম্মান দিতে প্রস্তুত?


মুসলিম আইন অনুযায়ী, ছেলেসন্তানের ক্ষেত্রে সাত বছর এবং কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত মা তাদের কাছে রাখার প্রাথমিক অধিকার পান। তবে এই সময় পার হলেই বাবা সন্তানকে নিজের কাছে নিয়ে নেওয়ার আইনি অধিকার দাবি করতে পারেন। উপরন্তু, মা যদি দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তাহলে তো আর কোন কথাই নেই। একদিকে তিনি যেমন সন্তানের জিম্মাদারি চিরতরে হারিয়ে ফেলেন, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্বামী এবং তার পরিবারের চাপেও সন্তানকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। কী ভয়ঙ্কর বৈষম্যমূলক নিয়ম। কেন দ্বিতীয় বিয়ে করলে একজন নারী তার সন্তানের জন্য ‘অযোগ্য’ হয়ে যাবেন, অথচ একজন পুরুষ একাধিক বিয়ে করলেও সন্তানের বৈধ অভিভাবক থাকেন—এই প্রশ্নের কোনো যৌক্তিক উত্তর প্রচলিত আইনে নেই। আইনের এই ফাঁদে পড়ে কত মা যে তার সন্তানকে চিরতরে হারিয়েছেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।


আইনি প্রক্রিয়ার এই জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা ডিভোর্সড মায়েদের জন্য সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। একটি কাস্টডি মামলার রায় হতে বছর পার হয়ে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিপক্ষের আইনজীবী, পরিবার ও সমাজের মুখোমুখি হতে গিয়ে একজন মাকে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা ভয়াবহ নির্মম ও অমানবিক। সমাজ, রাষ্ট্র, আইন এবং স্বামীর ও মেয়েটির নিজের পরিবার—সবাই মিলে একজোট হয়ে তাকে রীতিমতো ‘চরিত্রহীন’, সন্তান লালন-পালনে ‘অযোগ্যা’ অথবা ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ বানিয়ে ফেলে।


আইনের সবচেয়ে বড় ফাঁক হলো 'ভিজিটিং রাইটস' বা সন্তানের সঙ্গে দেখা করার অধিকার সঠিকভাবে কার্যকর না হওয়া। আদালত হয়তো সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বা মাসে দুদিন সন্তানকে মায়ের সঙ্গে দেখা করার আদেশ দেয়; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী বাবা বা সাবেক শ্বশুরবাড়ির পক্ষ আইনি আদেশ অমান্য করে সন্তানকে দূরে সরিয়ে রাখে। আদালত অবমাননার মামলা করে সেই অধিকার ফিরে পেতে পেতে শিশুটি মায়ের স্নেহ থেকে স্থায়ীভাবে বঞ্চিত হয়ে যায়। তার ওপর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সন্তানের মনে মায়ের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়—যাকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় 'প্যারেন্টাল অ্যালিয়েনেশন' বা 'সন্তানকে থেকে পর করে দেওয়ার মানসিক অপকৌশল' বলা চলে। এই প্রক্রিয়ায় শিশুর মনে মায়ের বিরুদ্ধে বিষাক্ত মানসিক দূরত্ব তৈরি করা হয়, যা আইনের চোখে অধরাই থেকে যায়।


যদিওবা কোনো মা লড়াই করে সন্তানের অধিকার পেয়ে যান, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামীর পরিবার কোনোভাবেই সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয় না। তাদের মানসিকতা থাকে—" জোর করে সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছ, এবার বোঝ মজা!" পরিস্থিতি আরও করুণ হয় যখন মায়ের নিজের পরিবারও তার এবং সন্তানের বোঝা টানতে চান না। একজন ডিভোর্সী নারী অনেক সময় তার নিজের পরিবারের কাছেই সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের শিকার হন। 'আরেকটু কেন মানিয়ে নিতে পারলে না'—এই খোঁটা দিয়ে তার নিজের পরিবারও মুখ ফিরিয়ে নেয়। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হলে সন্তানের আইনি খরচ ও ভরন-পোষণ চালানো অসম্ভব জেনে মায়েরা বুকে পাথর বেঁধে সন্তানকে বিসর্জন দেন। এরকম অবস্থাতেও সেই মায়েরাই সামাজিক ট্রলের শিকার হন সবচেয়ে বেশি।


সেই মায়েরাই আবার শুধুমাত্র সন্তানকে কাছে পাওয়ার জন্য প্রায়ই খোরপোশ বা দেনমোহরের দাবি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এর বিনিময়ে হয়তো তিনি সন্তানকে ফিরে পান কিন্তু তার কপর্দকশূন্য অবস্থার খোঁজ কেউ রাখে না। নিজের মৌলিক অধিকার বিসর্জন দিয়ে একজন মা যখন সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আইনি লড়াই করেন তখন সবচেয়ে বড় বলির পাঁঠা হয় শিশুটি। একদিকে সন্তান হওয়ার অপরাধে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো, তারপর মায়ের কাছে থেকে জোর করে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি শিশুর মনকে চিরতরে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও