শিক্ষার মেশিনটা বদলান, প্রত্যেক শিক্ষার্থীই পাস করবে
বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো ফি বছরের সবচেয়ে বড় জাতীয় ঘটনাগুলোর একটি। প্রতি বছরই আবার কোনো না কোনো চমকও থাকে এতে। এবারকার চমক হচ্ছে পাসের হার গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
সাড়ে ১৮ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭ লাখই ফেল করেছে। আর ভালো রেজাল্ট বলে পরিচিত যে জিপিএ ৫ তা অর্জন করেছে এক লাখের সামান্য কিছু বেশি শিক্ষার্থী। অতএব পরীক্ষা না দেওয়া, ফেল করা ও জিপিএ ৫ না পাওয়া মিলিয়ে বলা যায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থীই হয় মোটমুটি বা খারাপ ফল করেছে। আর এর মধ্যে ৭ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন এক চরম দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে পড়েছে। ইতোমধ্যে আত্মহত্যার খবর শোনা যাচ্ছে।
তিরিশ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র সাড়ে ছয়শো স্কুলে সবাই পাস করেছে আর তিনশোর বেশি স্কুলের সব শিক্ষার্থীই ফেল করেছে। বছরের পর বছর এসব দেখতে দেখতে আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাই তো শিক্ষামন্ত্রীসহ শিক্ষাব্যবস্থার অভিভাবকগণ চারদিক থেকে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন। বলছেন, পরীক্ষার ফল সুন্দর হয়েছে! এভাবে ঢেকুর তোলা যায়?
৭ লাখ শিক্ষার্থী কেন ফেল করল? শিক্ষাকর্মকতাদের সোজা উত্তর— পড়াশোনা না করলে এমনই হবে। মূলত ১ লাখ শিক্ষার্থীকেই বাছাই করা হয়েছে চূড়ান্ত মেধাবী হিসেবে। দশ-বারো বছর পড়ালেখার পর ৩০ ঘণ্টার পরীক্ষা দিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিশুকিশোরদের মেধা মেপে ফেলল। যে শিক্ষাব্যবস্থা তা পারে তাকে বিশ্বসেরা খেতাব দেওয়াই যায়। জাতির ৭ লাখ কিশোর-কিশোরী পুরাই মেধাহীন? যারা এইসব মেধার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন তাদের মাথাটা যে এক অত্যাশ্চর্য পদার্থ দিয়ে ভরা তাতে সন্দেহের কারণ নেই।
প্রতিবছরই বাংলাদেশের এরকম পনের থেকে আঠারো লাখ কিশোর বয়সীদের মধ্য থেকে লাখ খানেক মেধাবী খুঁজে বের করা হয়। এই মেধাবীদের কী কী প্রতিভা দ্বারা এই দেশ ও বিশ্ব উপকৃত, আর কী কী দিয়ে অপকৃত তাও একটু খুঁজে দেখা দরকার।
পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশে কি এখন এই ধরনের মেধা বাছাইয়ের তুঘলকি কাণ্ড চলে? ব্রিটিশ যে লক্কড়ঝক্কড় শিক্ষার মেশিনটা আমাদের দেশে বসিয়ে দিয়ে গেছে আমরা আজও তাই চালাচ্ছি। এর কোনো পরিবর্তনের ইচ্ছে কারো নেই। এই ৭ লাখ শিক্ষার্থীকে যদি শিশুকালে ফিনল্যান্ড কিংবা জাপান পাঠিয়ে দেওয়া হতো, তারা কেবল ভালোই করতো না, তারা ওই এক লাখ বাছাইকৃত মেধাবী ছেলেমেয়েকেও ভবিষ্যৎ জীবনে বহুগুণ ছাড়িয়ে যেত হয়তো। হয়তো কেন, যায় নিশ্চয়ই। নয়তো আমাদের মন্ত্রী, আমলারা তাদের নিজেদের ছেলেমেয়েকে হয় বিদেশে পড়ালেখা করতে পাঠান অথবা দেশের মধ্যে ওইরকম শিক্ষার অনুকরণ আছে যেসব শিক্ষপ্রতিষ্ঠানে সেখানে পড়ান। ফেল করার জন্য এই ৭ লাখ শিক্ষার্থীর বেশিরভাগই নিজেরা দায়ী নয়, দায়ী এই ফেইলড শিক্ষাব্যবস্থা।
আমাদের এসএসসি পর্যন্ত যেসব পাঠ্যবই আছে সেখানে এমন কী আছে যে সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন কোনো শিশুকিশোর তা বুঝতে সক্ষম হবে না? এমন একটা বিষয়ও এতে নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তারা পারছে না, সেই ব্যর্থতা প্রায় পুরোপুরি যারা শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তাদের। এসএসসি পর্যন্ত এই প্রাথমিক-মাধ্যমিক গোছের শিক্ষা শিশুকিশোরদের সেইভাবে শেখার কথা, যেভাবে তারা কথা বলতে ও হাঁটতে শেখে। সেজন্যই উন্নত দেশগুলোতে এই পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক, আনন্দদায়কও। যেকোনো সুস্থ স্বাভাবিক শিশু যেমন পরিবার ও সমাজের সহায়তায় কথা বলতে ও হাঁটতে শেখে, যেকোনো সুস্থ স্বাভাবিক শিশু একইভাবে পরিবার, সমাজ ও স্কুল-কলেজের সহায়তায় কথা বলতে, হাঁটতে ও পড়ালেখা করতে শেখে। শিশুর কথা বলতে পারা ও হাঁটতে পারা এক পরম আনন্দের বিষয়। কিন্তু এতে কেউ বিস্মিত হয় না, বিস্মিত ও ভীত হয় যদি শিশু তা না পারে।
এসএসসি পাস করা ও ভালো রেজাল্ট করাটা বিস্ময়ের কিছু নয়, বিস্ময়ের বিষয় ফল খারাপ করা এবং আরও বিস্ময়ের ব্যাপার ফেল করা। যতক্ষণ আমাদের সকল বিস্ময় ও উল্লাস ১ লাখ শিক্ষার্থীর অত্যুজ্জ্বল সাফল্যে ডুবে থাকবে, অথচ কোনো বিস্ময়, উদ্বেগ ও ব্যর্থতার দায়বোধ থাকবে না ৭ লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্যতায় ততক্ষণ এই লক্কড়ঝক্কড় মেশিনটাই চলবে, কিছুই বদলাবে না।