এসএসসির ফলাফল: নম্বরের বাইরে যে প্রশ্ন
‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, মন খুলে তো আর নম্বর দেওয়া যায় না’—এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের এই মন্তব্যটি আপাতদৃষ্টিতে রসিকতাপূর্ণ। কিন্তু এর ভেতরে বাংলাদেশের পরীক্ষা ও মূল্যায়নব্যবস্থার একটি গভীর বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। গান গাওয়ার সঙ্গে নম্বর দেওয়ার তুলনা হয়তো মজার, কিন্তু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী একটি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ‘মন খোলা’ না ‘মন বন্ধ’—সেটিই যদি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন জাগে, আমাদের মূল্যায়নব্যবস্থা আসলে কতটা নির্ভরযোগ্য?
এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
ফলাফল কমেছে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু ফলাফল কমে যাওয়াই কি খারাপ ফলাফলের সমার্থক? আবার পাসের হার বেড়ে গেলেই কি সেটি ভালো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রমাণ? এখানেই আমাদের আলোচনাকে একটু গভীরে নিতে হবে।
বাংলাদেশে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার মান পরিমাপের সবচেয়ে দৃশ্যমান সূচক। পাসের হার বাড়লে আমরা আনন্দ করি, জিপিএ-৫ বাড়লে উৎফুল্ল হই, আর কমলে ‘শিক্ষার মান পড়ে গেছে’ বলে হাহাকার করি। কিন্তু একটি পরীক্ষার ফলাফল মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্রের বিপরীতে শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সের চিত্র। এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাস্থ্যপরীক্ষা নয়।
বরং আমাদের বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—একজন শিক্ষার্থী এসএসসিতে পাস করার পর কী জানে? সে কি একটি জটিল বিষয় নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে? কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে? তথ্য যাচাই করতে পারে? যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ করতে পারে? গণিতের সূত্র মুখস্থ না করে তার প্রয়োগ বুঝতে পারে? বিজ্ঞানকে শুধু পরীক্ষার খাতায় নয়, বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে?
এসব প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক না হলে শতভাগ পাসও আমাদের আত্মতুষ্ট করার মতো সাফল্য নয়। তবু পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ হওয়াকে হালকাভাবে দেখারও সুযোগ নেই। কারণ এর অর্থ হলো পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। এদের একটি অংশ হয়তো নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পায়নি, কেউ মানসম্মত শিক্ষক পায়নি, কেউ পারিবারিক বা আর্থিক সংকটে পড়েছে, কেউ হয়তো পরীক্ষার চাপ সামলাতে পারেনি। আবার কারও ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র, মূল্যায়ন কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির সঙ্গে বাস্তব শিক্ষার দূরত্বও ভূমিকা রাখতে পারে।
ফলে ফলাফল বিশ্লেষণের সময় শুধু ‘কতজন পাস করল’ প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়। কোন বোর্ডে কেন পাসের হার কম, কোন বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে, শহর ও গ্রামের ব্যবধান কত, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য কোথায়, ছেলে-মেয়ের ফলাফলে কী পরিবর্তন এসেছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।
শিক্ষামন্ত্রীর আরেকটি মন্তব্য এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পুনঃপরীক্ষণের জন্য আবেদন করা শিক্ষার্থীদের খাতা সম্পূর্ণভাবে পুনঃপরীক্ষা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালের বোর্ড আইনে খাতা পরিদর্শনের ব্যবস্থা ছিল না; বর্তমানে সেটি পরিবর্তন করা হয়েছে। কোনো ভুলত্রুটি থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি বলেছেন।