গবেষণা শেষে দেশে ফেরার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে

যুগান্তর ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৫

গত ২৩ জুলাই যুগান্তরে উদ্বেগজনক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যা একজন প্রবীণ শিক্ষক হিসাবে আমাকে অত্যন্ত ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন করেছে। এতে বলা হয়েছে, উচ্চতর গবেষণা ও শিক্ষার অজুহাতে একশ্রেণির শিক্ষক বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফিরে আসছেন না। দিনদিন এ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। অনেকে উচ্চশিক্ষার নামে বিদেশে গিয়ে পরিবার-পরিজনসহ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকশ শিক্ষক উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার নামে বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফিরে আসেননি। এমনকি অনেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে দেশে ফিরে এলেও আবারও বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ফলে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে।


জ্ঞানের শুরু আছে, শেষ নেই এবং জ্ঞানের জগতের কোনো সীমারেখা নেই। জ্ঞান আহরণের নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা অঞ্চল নেই। যেখানে জ্ঞানভান্ডার আছে, সেখান থেকেই জ্ঞান আহরণ করতে হবে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে গেলেও যথাসময়ে ফিরে এসেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে গিয়ে আর ফিরে না আসার ঘটনা ক্রমেই বেড়েছে। বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে গেলে তিনি আর ফিরে আসবেন কি না, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।


বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষা অথবা গবেষণার জন্য বিদেশে গমন করে দেশে ফিরে না আসার হার কত, তা সঠিকভাবে বলা যাবে না। কারণ, এ সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য মোতাবেক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য বিদেশ গমন করেন, তাদের মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আর দেশে ফিরে আসেন না। ইউজিসির ২০২১-২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য মোতাবেক, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষক উচ্চতর শিক্ষা বা গবেষণার জন্য শিক্ষা ছুটিতে ছিলেন। তাদের মধ্যে ২৭০ জন বা প্রায় ১৬ শতাংশ আর দেশে ফিরে আসেননি। গত দেড় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শতাধিক শিক্ষক বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফিরে আসেননি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে বিদেশে গিয়ে দেশে না ফেরার হার আরও অনেক। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ শিক্ষক বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য গিয়ে আর দেশে ফিরে আসছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিদেশে ভালো সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশায় সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যান। ইউজিসি প্রদত্ত হিসাব মোতাবেক, প্রতিবছর বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ থেকে ১৫০ জন শিক্ষক চূড়ান্তভাবে বিদেশে থেকে যান। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ২০ থেকে ৪০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়।


বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফিরে না এলে শুধু যে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয় তা নয়, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দেখা দেয়। কারণ, একজন শিক্ষক বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানো পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার পরিবর্তে আরেকজন শিক্ষককে নিয়োগ দিতে পারে না। এতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মারাত্মক ক্ষতি হয়। অর্থ পাচার এবং শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফিরে না আসার মধ্যে একটি ক্ষেত্রে সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। অর্থ পাচারকারীরা তাদের কষ্টার্জিত সম্পদ দেশের স্বার্থে ব্যবহার না করে অন্য দেশের উন্নয়নে ব্যয় করেন। আর বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা অথবা গবেষণার কাজে গিয়ে দেশে ফিরে না আসা শিক্ষকরা তাদের মূল্যবান মেধা নিজ দেশের কল্যাণে কাজে না লাগিয়ে অন্য দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করেন। শিক্ষক হচ্ছেন জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। একজন শিক্ষক তৈরি করতে দেশ ও জাতিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। জনগণের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায় তারা তাদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করেন এ প্রত্যাশায় যে, তারা উচ্চশিক্ষা সমাপন করে দেশের জনগণের কল্যাণে তা বিনিয়োগ করবেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগদানের পূর্বপর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্র ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যয় করে। এছাড়া একজন উপযুক্ত শিক্ষক গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।


শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র তার প্রত্যেক নাগরিকের জন্য উপযুক্ত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে বাধ্য। কিন্তু তারপরও আমাদের মতো দেশে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। যাদের সন্তান শিক্ষা অর্জন করতে পারে না, তাদেরও জাতির শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ট্যাক্স দিতে হয়। শিক্ষা হচ্ছে একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। দেশের প্রত্যেক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষার জন্য বিনিয়োগ করেন; কিন্তু সবাই সেই বিনিয়োগের সুফল ভোগ করতে পারেন না। কাজেই যারা শিক্ষা অর্জন করেন, তারা জাতির কাছে ঋণী থাকেন। কিন্তু তারা যদি বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যান, তাহলে তাদের পক্ষে সেই ঋণ শোধ করা সম্ভব হয় না।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও