পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্প এবং ১৪টি সমস্যা: কেন নতুন সমীক্ষা জরুরি

প্রথম আলো সুবাইল বিন আলম প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩১

২০১২ সালে ৫৬৩ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত ফিজিবিলিটি রিপোর্ট জমা পড়েছিল। সেখানে হাইড্রোলজি, মরফোলজি, পরিবেশ, অর্থনীতি, সামাজিক প্রভাব ও প্রকৌশল নকশা সব ছিল। কিন্তু রিপোর্টটি ছিল ২০১২ সালের পদ্মার জন্য, ২০১২ সালের জলবায়ুর জন্য। এখন ২০২৬ সাল। রিপোর্টটির বয়স ১৪ বছর। এই ১৪ বছরে নদী, জলবায়ু, কূটনীতি ও প্রযুক্তি সব বদলে গেছে। অথচ সেই পুরোনো সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে ৫০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।


সমস্যা এক: পানির মূল হিসাবটাই প্রশ্নবিদ্ধ


রিপোর্টে শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহের পুরো হিসাব দাঁড়িয়ে আছে দুটো অনুমানের ওপর। প্রথমত, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি বহাল থাকবে। দ্বিতীয়ত, ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সালের প্রবাহের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। দুটো অনুমানই এখন ভেঙে পড়েছে।


গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হয়ে গেছে। নতুন চুক্তির কোনো নিশানা নেই। ফারাক্কা-পূর্ব যুগে পাংশায় শুষ্ক মৌসুমে গড় প্রবাহ ছিল ২,০৩১ কিউমেক। চুক্তি-পরবর্তী সময়ে সেটা নেমে আসে ৫৭৬ কিউমেকে, কোনো কোনো বছর আরও কম। চুক্তি ছাড়া এটা আরও কমার সম্ভাবনাই বেশি। তার ওপর উজানে ভারতের পানি প্রত্যাহার প্রতি দশকে বাড়ছে। ২০১০ সালের পরের ১৬ বছরের প্রবাহ তথ্য এই রিপোর্টে নেই।


সমস্যা দুই: পলির হিসাবে ফারাক্কার শিক্ষা নেই


রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, পাংশায় ব্যারাজ হলে ৬০ বছরে নদীর তলদেশ মাত্র ৩ দশমিক ২৮ ফুট উঁচু হবে। ফারাক্কার বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সেখানে মাত্র ৫২ বছরে নদীতল প্রায় ২০ ফুট উঁচু হয়ে গেছে। একই ধরনের নদীতে একই ধরনের কাঠামো দিয়ে এত বড় পার্থক্য হওয়া মানে মডেলিংয়ের মূল দর্শনেই সমস্যা আছে।


পাংশায় গঙ্গা বছরে আনুমানিক ৪৫০ মিলিয়ন টন পলি বহন করে। রিপোর্টে ১৮টি আন্ডারস্লুইসের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু মোট ব্যারাজ দৈর্ঘ্যের তুলনায় এই স্লুইসগুলোর মোট প্রস্থ মাত্র এক-অষ্টমাংশ। পলিবহুল এই নদীতে এগুলো দ্রুত বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং পানির নিচে থাকায় পরিষ্কার করাও কঠিন। কখন স্লুইস খুলবে, কতটুকু খুলবে, কোন মৌসুমে কী কৌশল নেওয়া হবে, সেই বৈজ্ঞানিক পরিচালনা নির্দেশিকা রিপোর্টে নেই।


রিপোর্টে পলিসংক্রান্ত গাণিতিক মডেলিং করা হয়েছিল ২০০৮ সালের তথ্য দিয়ে। ২০০৮ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত পদ্মার নদী খাত, পলির ধরন ও পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুরোনো মডেল দিয়ে পলির হিসাব করা মানে ভুল উত্তর নিশ্চিত করা।


সমস্যা তিন: লোকেশনের প্রশ্নটা বন্ধ করা হয়েছে


২০১২ সালে পাংশা পয়েন্ট নির্বাচন করা হয়েছিল তৎকালীন নদীর রূপতত্ত্বের ভিত্তিতে। ২০১৭ সালে সেই নকশা বাতিল করা হয়েছিল নকশায় ত্রুটি এবং উজানে পলি, জলাবদ্ধতা ও পাড়ভাঙনের আশঙ্কার কারণে। নয় বছর পরে সেই একই পাংশা পয়েন্টে পুনরায় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, কিন্তু ২০১৭ সালের সমস্যাগুলোর কারিগরি সমাধান জনসমক্ষে স্পষ্ট করা হয়নি।


সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, পাংশাই একমাত্র বিকল্প কি না, সেটা কখনো বহুমানদণ্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি। হাইড্রোলিক কার্যকারিতা, পলির বোঝা, জমি অধিগ্রহণের মাত্রা, নৌচলাচল, খরচ এবং জলবায়ু–সহনশীলতা, এই ছয়টি মানদণ্ডে একাধিক পয়েন্টের তুলনামূলক মূল্যায়ন না করে যেকোনো লোকেশন বেছে নেওয়া মানে অনুমানের ওপর হাজার কোটি টাকার বাজি ধরা। পদ্মার গতিপথ ২০১২ সাল থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। চর জেগেছে, তীর ভেঙেছে, প্রবাহের মূল ধারা সরে গেছে। নতুন জরিপ ছাড়া নিশ্চিত করা যাবে না পাংশা এখনো সেরা পয়েন্ট কি না।


সমস্যা চার: ভাটির মানুষদের কথা হিসাবেই নেই


পাংশার ভাটিতে গোয়ালন্দ পর্যন্ত আরও ২০ থেকে ২৩ কিলোমিটার নদী। পাংশায় পানি আটকে রাখা হলে এই অংশে প্রবাহ কমবে। উজানে ফারাক্কা আটকায়, ভাটিতে পাংশা আটকায়, মাঝখানে নদী নিঃশেষ। এই ‘ডাবল ফারাক্কা’ পরিস্থিতির প্রভাব আড়িয়াল খাঁ, কুমার ও গড়াই অঞ্চলে কেমন হবে, সেটার কোনো বিশ্লেষণ রিপোর্টে নেই।


গড়াইতে শুষ্ক মৌসুমে ১৯৮৮ সাল থেকে কার্যত কোনো প্রাকৃতিক প্রবাহ নেই। এর ফলে খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা দ্বিগুণ এবং বরদিয়া পয়েন্টে সর্বোচ্চ লবণাক্ততা আট গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য লবণাক্ততা কমানো, কিন্তু ভাটির প্রবাহের ওপর প্রভাব না জেনে এটা উল্টো ফল দিতে পারে। এই ঝুঁকির মূল্যায়ন রিপোর্টে অনুপস্থিত।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও