পকেটে একটি টিস্যু ও নাগরিক সচেতনতার নবতর পাঠ
একটি জাতির অভ্যাসগত বৈশিষ্ট্য অনেক সময় বড় বড় দৃশ্যকল্পে চিত্রিত হয় না, বরং দৃশ্যমান হয় জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক জীবনের ছোট ছোট কর্মকাণ্ডে। আমরা উন্নয়নকে সাধারণত উঁচু সেতু, প্রশস্ত মহাসড়ক কিংবা আধুনিক নগরীর আলোয় মাপি। কিন্তু উন্নত সমাজের আরেকটি অদৃশ্য অবকাঠামো আছে, যার নাম নাগরিক শৃঙ্খলা। সেই শৃঙ্খলার শুরু হয় খুব সাধারণ কিছু কাজ দিয়ে। যেমন, রাস্তার ওপর প্লাস্টিক না ফেলা, নিজের আবর্জনা নিজে বহন করা, কিংবা একটি ব্যবহৃত টিস্যু ডাস্টবিন না পাওয়া পর্যন্ত নিজের কাছেই রেখে দেওয়া।
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরিশাল সফরের মাঝে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, তার প্যান্টের পকেটে হাত দিলেই ব্যবহৃত টিস্যু পাওয়া যাবে। কারণ তিনি টিস্যু ব্যবহার করে যেখানে-সেখানে ফেলেন না, ডাস্টবিন না পাওয়া পর্যন্ত নিজের কাছেই রাখেন। বক্তব্যটি শুনে কেউ হয়তো এটিকে নিছক ব্যক্তিগত অভ্যাস হিসাবে দেখেছেন। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, এটি শুধু একজন ব্যক্তির অভ্যাস নয়, এটি একটি নাগরিক দর্শন।
আমাদের সমাজে পরিচ্ছন্নতার ধারণাটি এখনো অনেকাংশে দায়িত্ব হস্তান্তরের সংস্কৃতির মধ্যে আটকে আছে। আমরা ঘর পরিষ্কার রাখি, কিন্তু ঘরের আবর্জনা রাস্তায় ফেলতে সংকোচ বোধ করি না। দোকানের সামনে চায়ের কাপ রেখে চলে আসি। গাড়ির জানালা দিয়ে পানির বোতল কিংবা চিপসের প্যাকেট ছুড়ে ফেলি। মনে করি, এগুলো পরিষ্কার করা অন্য কারও দায়িত্ব। অথচ সভ্য সমাজে পরিচ্ছন্নতা শুরু হয় এই উপলব্ধি থেকে যে, জনপথও আমার ঘরেরই সম্প্রসারিত অংশ।
অনেক উন্নত দেশের নাগরিকদের দেখলে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয় : সেখানে আইন আছে, জরিমানাও আছে, কিন্তু এর চেয়েও বড় বিষয় হলো সামাজিক অভ্যাস। জাপানে মানুষ নিজের আবর্জনা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাগে করে বহন করে, কারণ আশপাশে ডাস্টবিন নাও থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শেষে জাপানি সমর্থকদের গ্যালারি পরিষ্কার করার দৃশ্য এখন বিশ্বজুড়ে নাগরিক দায়িত্ববোধের প্রতীক। সিঙ্গাপুরে পরিচ্ছন্নতা শুধু সরকারের কর্মসূচি নয়, এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অংশ। ইউরোপের বহু শহরে পার্কে বসে খাবার খাওয়ার পর নিজের আবর্জনা নিজেই নির্দিষ্ট বিনে ফেলে আসা এতটাই স্বাভাবিক যে সেটি নিয়ে আলাদা করে কেউ প্রশংসাও করে না।
আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি, তারা কেন উন্নত? উত্তরটি অনেক সময় অর্থনীতির চেয়ে অভ্যাসে লুকিয়ে থাকে।
বাংলাদেশের নগরজীবনের একটি বড় সংকট বর্ষাকালের জলাবদ্ধতা। বৃষ্টি হলেই শহরের অনেক এলাকায় হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানি জমে যায়। আমরা তখন স্বাভাবিকভাবেই ড্রেনের নকশা, সিটি করপোরেশন কিংবা উন্নয়ন সংস্থার ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করি। এসব প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরেকটি প্রশ্নও করা দরকার। ড্রেনে জমে থাকা পলিথিন, প্লাস্টিক, বোতল, খাবারের মোড়ক কিংবা টিস্যুগুলো সেখানে এলো কীভাবে?
- ট্যাগ:
- মতামত
- শৃঙ্খলা বজায়
- বদ অভ্যাস
- নাগরিক জীবনমান