ঝরে পড়া শিক্ষার্থী কেন বাড়ছে?
বাংলাদেশে প্রতিবছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ে। নতুন বই ছাপা হয়, নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মিত হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ে, শিক্ষাবাজেট নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এই দৃশ্যমান অগ্রগতির আড়ালে আরেকটি বাংলাদেশ নীরবে তৈরি হচ্ছে-যেখানে প্রতিবছর লাখ লাখ শিশু ও কিশোর শিক্ষার পথ থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। তারা পরীক্ষার ফলাফলে নেই, ভর্তি-পরিসংখ্যানে নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নে নেই। তারা আছে ইটভাটায়, কারখানায়, ক্ষেতে, গ্যারেজে, অভিবাসনের ঝুঁকিপূর্ণ পথে কিংবা খুব অল্প বয়সে বিয়ের সংসারে।
০২ জুলাই ২০২৬ উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি ও সমমান) পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সেই পরীক্ষায় প্রায় সাত লাখ নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকার ঘটনা নতুন করে সেই অদৃশ্য বাংলাদেশের দিকে তাকাতে বাধ্য করেছে। এই সাত লাখ হলো একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ না করা এবং ফরম পূরণ করেও পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত বাস্তবতা।
সংখ্যাটি কেবল একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়, এটা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ক্ষয়, সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক চাপ এবং নীতিগত দুর্বলতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। যে দেশে একটি পরীক্ষায় এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে সমস্যাটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতার নয়- রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার সম্মিলিত সংকট।
২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমানে পাস করেছিল প্রায় ১৬.৭২ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে প্রায় ১.৮০ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতেই ভর্তি হয়নি। যারা ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যে আরও প্রায় ৫.৪৪ লাখ শিক্ষার্থী নিয়মিত এইচএসসি পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেনি।
পরীক্ষার প্রথম দিন আবার ২৪,৭৮৪ জন ফরম পূরণ করেও পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ, এসএসসি পাস করা একটি ব্যাচ থেকে ৭.২৪ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত এইচএসসি পরীক্ষার ধারাবাহিকতা থেকে হারিয়ে গেছে।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার তথ্য বলছে, নিয়মিত নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একাদশ শ্রেণিতে নিয়মিত নিবন্ধিত ছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ শিক্ষার্থী। কিন্তু পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে মাত্র ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। অর্থাৎ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন বা ৩৩.০৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেনি।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষায়। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪৪.০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫৪.৫৮ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি। এরপরও যারা ফরম পূরণ করেছে, তাদের মধ্যেও পরীক্ষার প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিল ২৪ হাজার ৭৮৪ জন। অর্থাৎ, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষায় পৌঁছানোর আগেই শিক্ষা-ধারা থেকে ছিটকে পড়েছে।