স্পেনের রুপার স্বপ্ন ও আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক রূপান্তর
পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ। চলছে সমুদ্র অভিযানের যুগ—এজ অব ডিসকভারি। স্পেন ও পর্তুগালের পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য শক্তিও নতুন পৃথিবীর দিকে ছুটছে।
ক্রিস্টোফার কলম্বাস, ফার্দিনান্দ ম্যাগেনাল, আমেরিগো ভেসপুচির পালতোলা জাহাজ তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে মহাসমুদ্রের বুকে।
১৪৯৪ সালের টরডেসিলাস চুক্তি অনুযায়ী স্পেন ও পর্তুগাল দক্ষিণ আমেরিকাকে কাল্পনিক বিভাজন রেখা টেনে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।
নতুন পৃথিবীতে ভবিষ্যতে আবিষ্কৃত পূর্বাংশ পাবে পর্তুগাল, আর পশ্চিমে যা আবিষ্কৃত হবে তা হবে স্পেনের! এ যেন ইতালিয়ান পিৎজার স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ স্লাইসিং!
এর ফলে বর্তমান ব্রাজিলের অধিকাংশ অঞ্চল পর্তুগালের অধীনে, আর মহাদেশটির পশ্চিম ও দক্ষিণের বিশাল অংশ—বর্তমান আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার বড় অংশ স্পেনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
১৫১৬ খ্রিষ্টাব্দে স্প্যানিশ নাবিক হুয়ান দিয়াস দে সোলিস আটলান্টিক মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য পথ খুঁজতে গিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার এক বিশাল নদীমোহনায় প্রবেশ করেন।
মোহনাটির বিশালতা এবং পানির মিষ্টতার কারণে তিনি এর নাম দেন ‘মার দুলসে’, অর্থাৎ ‘মিষ্টি সমুদ্র’। কিন্তু নদীর তীরে নামার পরই তিনি স্থানীয় চারুয়া আদিবাসীদের আক্রমণের মুখে পড়ে নিহত হন। তাঁর সঙ্গীরা প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে যান স্পেনে।
সোলিসের মৃত্যুর এক দশক পর ইতালীয় বংশোদ্ভূত স্প্যানিশ অভিযাত্রী সেবাস্তিয়ান ক্যাবট একই নদীমোহনায় পৌঁছান। তিনি স্থানীয় মানুষের গলায় রুপার অলংকার দেখেন এবং অভ্যন্তরে কোথাও বিশাল রুপার খনি থাকার কিংবদন্তি শোনেন।
ইনকা সাম্রাজ্যের বিপুল সম্পদের গল্পও তখন ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল। ক্যাবটের অভিযানের পর থেকেই নদীটি ‘রিও দে লা প্লাতা’ অর্থাৎ ‘রুপার নদী’ নামে পরিচিতি পায়।
যদিও এই নদীপথে কাঙ্ক্ষিত রুপার পাহাড়ের সন্ধান কখনোই মেলেনি, তবু সেই ‘রুপার স্বপ্ন’ থেকেই পরবর্তী সময়ে সমগ্র অঞ্চলের নাম হয় আর্জেন্টিনা। লাতিন ভাষায় আর্জেন্টাম শব্দের অর্থই হলো রুপা।
আর্জেন্টিনায় স্প্যানিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্থানীয় আদিবাসীরা শুরু থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
১৫৩৬ সালে পেদ্রো দে মেন্দোজা প্রথম বুয়েনস এইরেসে বসতি স্থাপন করলে স্থানীয় কুয়েরান্দি আদিবাসীরা বারবার আক্রমণ চালায়।
চরম খাদ্যসংকট ও অব্যাহত প্রতিরোধের মুখে স্প্যানিশরা ১৫৪১ সালে বসতিটি পরিত্যাগ করে। পরবর্তী সময়ে ডায়াগুইটা, মাপুচে এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরোধ চালিয়ে যায়।
তবে উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র, ঘোড়া এবং ইউরোপীয় সামরিক প্রযুক্তির কারণে শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশরা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত আসে যুদ্ধ নয়, রোগ থেকে। ইউরোপীয়দের মাধ্যমে গুটিবসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
এসব রোগের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রাকৃতিক প্রতিরোধক্ষমতা না থাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধ, রোগ এবং ভূমি দখল—সম্মিলিত আক্রমণে আদিবাসী জনসংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
১৭৭৬ সালে স্পেন ‘রুপোর নদী’র তীরে ‘ভাইসরয়্যালটি অব দ্য রিও দে লা প্লাতা’ প্রতিষ্ঠা করে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ফাইনাল ম্যাচ
- ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬