‘মুই মইরবার আগোত খুনিগুলার শাস্তি দ্যাখবার চাং’
দুপুরের রোদে বারান্দায় বসে আছেন মনোয়ারা বেগম। তার হাতে ফ্রেমবন্দি একটি ছবি—তার ছেলে আবু সাঈদের। দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবির পাশে লেখা, ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের বাবনপুর গ্রামের ছোট্ট আধাপাকা বাড়িটির প্রায় প্রতিদিনের দৃশ্য এটি।
দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ক্যালেন্ডারে সময় বদলেছে, ঋতু পাল্টেছে। কিন্তু এই পরিবারের কাছে সময় যেন থেমে আছে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ে—যেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ।
মনোয়ারা কখনো শাড়ির আঁচল দিয়ে ফ্রেমে জমে থাকা ধুলা মোছেন, কখনো নির্বাক তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে। কিছুক্ষণ পরই তার চোখ ভিজে যায়।
‘মোর সাঈদটা কই গেল রে...মোর ছইলডা তো আর ফিরল না...’ কেঁদে ওঠেন মনোয়ারা।
তিনি বলেন, ‘মোর ছইলটা (ছেলে) যামরাগুলা (যারা যারা) গুলি করি মারি ফ্যালাইছে। আদালত রায় দিছে, কিন্তু অ্যালাং (এখনো) রায় কার্যকর হইলো না। মুই মইরবার আগোত (আগে) খুনিগুলার শাস্তি দ্যাখবার চাং (চাই)। যার বুকের ধন চলি যায়, সেই বোঝে কত কষ্ট। মোর ছইলডা কি আর ফিরি আইসবে? টাকা-পয়সা দিয়া কি ছইল ফিরি আনা যায়?’
এরপর আর কথা শেষ করতে পারেননি তিনি। গলা ধরে আসে মনোয়ারার।
ঘরের কোণে রাখা পুরোনো একটি ব্যাগে এখনো যত্ন করে সাজিয়ে রাখা আছে আবু সাঈদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র, ইংরেজি সাহিত্যের কয়েকটি বই, কিছু খাতা আর একটি কলম।
আঙুলের ইশারায় ব্যাগটি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এইল্যা মুই কাকো ধইরবার দ্যাং না। এইল্যা মোর ছইলের স্মৃতি।’
গত এক মাস ধরে অসুস্থ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন। তার বেশির ভাগ সময়ই কাটে বিছানায়। কথা বলতে গেলেই চোখ ভিজে যায়।
‘হামার ছইলডা খুব মেধাবী আছিলো বাহে। বাঁচি থাকিলে বড় চাকরি পাইলো হয়। ওই ছইলডায় হামার সব স্বপ্ন আছিলো। হামার খবর নিছিলো। ছইলডাক গুলি করি মারার পর থাকি মুই ঠিক মতো নিনদিবার পাবার নাইকছোং না (ঘুমাতে পারছি না)। চোখ বন্ধ করলেই ছইলডার মুখ ভাসি উঠে। শুধু একটা প্রশ্ন—খুনিগুলার ফাঁসি কোনদিন হইবে?’