হরমুজে লুকিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির চাবি
আমরা ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি, বিশ্বের তিন ভাগ জল, আর এক ভাগ স্থল। সেই এক ভাগ স্থলের বড় অংশ আবার মানবসভ্যতার আদিকাল থেকে নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জর্জরিত। সেসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত যে কেবল স্থলের ওপরের স্বার্থ নিয়ে, তা কিন্তু নয়। বহু ক্ষেত্রে জলভাগও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যও এর ব্যতিক্রম নয়। এই অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে চলে আসা দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আগুনেও জলভাগ ঘি ঢালছে প্রতিনিয়ত।
প্যাসিফিক ইনস্টিটিউট ফর স্টাডিজ ডেভেলপমেন্ট, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি একটি আমেরিকান অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, বিশ্বে বিগত সাড়ে ৪ হাজার বছরে জলসীমা কিংবা জলভাগের দখল অথবা জলভাগ ব্যবহারসংক্রান্ত কারণে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৭০০টির বেশি।
মার্কিন আরেক গবেষণা সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য বলছে, এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে এমন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সংখ্যা ৪২০টির মতো। এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত আবার বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হচ্ছে না। মূলত তিনটি অঞ্চলে পানি নিয়ে সংঘাত কিংবা দ্বন্দ্ব সবচেয়ে বেশি। এই তিন অঞ্চল হলো—মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়া।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের কল্যাণে আমরা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব এরই মধ্যে জেনে গেছি। ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধে নেমেছিল, তার সমাধান এখন আটকে গেছে হরমুজে। এর আগে একটি লেখায় আমি উল্লেখ করেছিলাম, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে যে কয়টি বিষয় প্রাধান্য পাবে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো হরমুজ। কারণ, পুরো বিশ্ব এরই মধ্যে বুঝে গেছে যে হরমুজ বন্ধ হওয়া মানে বৈশ্বিক অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরা। আর ইরান বুঝে গেছে, হরমুজ তার কাছে পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র।
আর এ কারণেই আমরা এবারও দেখলাম, হরমুজকে ঘিরেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেস্তে গেল। আবারও মধ্যপ্রাচ্যে বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। ইরান এরই মধ্যে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানার নামে কুয়েতসহ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে হামলা চালিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, হরমুজ নিয়ে এত দ্বন্দ্ব কেন? মধ্যপ্রাচ্যে তো আরেকটি বিকল্প জলপথ আছে—লোহিতসাগর। লোহিতসাগর মূলত ভূমধ্যসাগরকে এডেন উপসাগর হয়ে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর মধ্যে লোহিতসাগর আর ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করেছে মানবনির্মিত সুয়েজ খাল। অপরদিকে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর হয়ে আরব সাগরে যুক্ত করেছে। লোহিতসাগরের তীরের দেশগুলো হলো সৌদি আরব, মিসর, ইয়েমেন, ইরিত্রিয়া ও জিবুতি। আকাবা উপসাগরের কল্যাণে লোহিতসাগরের ভাগ পেয়েছে ইসরায়েল ও জর্ডান। এসব দেশের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র তেলসমৃদ্ধ দেশ হলো সৌদি আরব। লোহিতসাগরের এক পারের সিংহভাগ এই দেশটির নিয়ন্ত্রণে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- হরমুজ প্রণালী
- মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ